Home Textile Manufacturing ঐতিহ্যের নীল দর্পন, সমৃদ্ধি ও অর্জন

ঐতিহ্যের নীল দর্পন, সমৃদ্ধি ও অর্জন

নীল ফুলের নীল পদ্ম আজ,
নীলিমার মায়ায় আবদ্ধ।
সবকিছু আজ তাই যেন,
নীলের মাঝেই সীমাবদ্ধ।
নীল যে তাহার মিষ্টি ভীষণ,
নীল যে তাহার প্রিয়।
নীলের মাঝেই জীবন তাহার,
নীলের মাঝে সেও।

মাথার উপর সীমাহীন ঐ আকাশ অথবা দৃষ্টিজুড়ে নীল জলরাশি কার না ভালো লাগে।
যদি বলা হয় তোমার পছন্দের রং কী??? অধিকাংশই বলবে নীল ছাড়া আর কি।
নীল পদ্ম, নীল শাড়ী- চূড়ি, নীলাঞ্জনা, নীল নদ, নীল ধ্রুবতারা, নীল ডায়েরীর গল্প উপেক্ষা করে কার সাধ্য। সাহিত্য কিংবা জীবনে নীল রং সত্যিই অবাধ্য। তাই নীলের বহুমাত্রিক ব্যবহার ও আদ্যোপান্ত নিয়ে শুরু করছি আজকের নীল সমাচার।

পরিচিতি:

নীল গুল্ম জাতীয়, শিম পরিবার ভুক্ত একটি উদ্ভিদ। স্থানীয়ভাবে এটি নিলিনী, রঞ্জনী, গ্রামিনিয়া, কালোকেশী, মধুপত্রিকা, নীলপুষ্প ইত্যাদি নামে পরিচিত।

বৈজ্ঞানিক নাম: Indigofer tinctoria। এটি Fabaceae পরিবারের সদস্য। এই উদ্ভিদ থেকেই প্রাকৃতিকভাবে নীল উৎপাদন করা হয়। নীল গাছ সাধারণত ১ থেকে ২ মিটার লম্বা ঝোঁপালো হয় এবং এর আয়ুষ্কাল ৬ মাসের মতো। নীলের প্রায় ৭৫০ টি প্রজাতি পাওয়া যায়। তবে নীল উৎপাদনের জন্য বিশেষ উপযোগী দুটি জাত Indigofera tinctoria ও Indigofera suffruticosa । নীল বা indigo কে বলা হয় The king of colour’s.

ইতিহাস: পুরাকালে মিশর, গ্রীস ও রোমের লোকেরা নীলের কথা জানত। ভারতীয় উপমহাদেশের মাটি নীল চাষের উপযোগী হওয়ায় ব্রিটিশ বণিকেরা প্রথম বাণিজ্যিক ভাবে নীলের চাষ শুরু করে। এই ভূখন্ডে ইন্ডিগোফেরার ১৫ প্রাজাতির গাছ জন্মালেও Indigofera tinctoria চাষ করা হতো ভারতে। নদীয়া,যশোর,বগুড়া ও রংপুর জেলায় ব্যাপকভাবে নীল চাষ করা হতো।

নীলের কালো অধ্যায়:
ভারতবর্ষের মাটি উর্বর থাকায় ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নীল চাষ করাত। ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দের পর ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতা ইংরেজরা গ্রহন করলে ১৭৭৯ খ্রীস্টাব্দে এ কোম্পানী সবাইকে নীল চাষ করার এলান জারি করে। কিন্তু এতেও কৃষকদের মাঝে নীল চাষে কোন আগ্রহ না পেয়ে ভিন্ন উপায় অবলম্বন করে। ইংরেজ ব্যবসায়ীরা অনেকে বঙ্গদেশ ও বিহারের চাষীদের দিয়ে জোর করে নীল চাষ করিয়ে বিদেশে রপ্তানি করত। কালক্রমে নীল চাষের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেলে স্থানীয়ভাবে নীল চাষের তদারকির সুবিধার্তে ইংরেজরা গ্রামে কুঠি স্থাপন করে। এ কুঠিই নীল কুঠি নামে বাংলার আনাচে কানাচে কষ্টস্মৃতির মিনার হিসেবে ইতিহাসের নীরব কান্না বহন করছে। ১৮৪৭ থেকে ১৮৫৭ খ্রীস্টাব্দে বিশ্ববাজারে নীলের দাম প্রায় দ্বিগুণ বাড়লেও কৃষকরা নায্য মূল্য পেত না। কারণ তাদের একমাত্র ক্রেতা ছিলো নীলকর ইংরেজ । সে সময় ভাটির বাংলার প্রায় অর্ধেক নীল উৎপাদিত হতো বঙ্গদেশের নদীয়া ও যশোর জেলায়। নীল চাষে অন্য যে কোন ফসলের তুলনায় তৎকালীন কৃষকদের ক্ষতি হতো ৭ টাকা। অনিচ্ছুক চাষীদের নীলচাষে বাধ্য করা, ভালো ও উর্বর জমিতে জোর করে খুটি পুঁতে আসা। এমনকি নীল সংগ্রহ ও কেনার সময় সব অর্থ পরিশোধও করতো না। উপরন্তু চাষীদের উপর নির্যাতন চালানোর জন্য এদের ছিল পেয়াদা ও লাঠিয়াল বাহিনী। এ ক্ষমতা সস্পন্ন ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ই নীলকর নামে পরিচিত। তাদের নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য অনেক বিত্তশালী গৃহস্থ গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে, স্থানীয় যুবতীরা তাদের সম্ভ্রম রক্ষায় ব্যর্থ হয়, বহু প্রতিবাদী মানুষ জীবন হারায়।

“নীলকর বিষকর বিষফোড়া মুখ, অনল শিখায় ফেলে দিল যত সুখ।”——– নীলকরদের নির্যাতন আর নীল চাষীদের শোচনীয় অবস্থা তুলে ধরার জন্য উক্ত পঙতিটুকুই যথেষ্ট।১৯ শতকের শেষের দিকে নীল চাষ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হওয়ায় কৃষকরা ধান ও পাট চাষে ঝুঁকে পড়ে।১৮৫৯ সালে নীল বিদ্রোহের মাধ্যমে অবসান ঘটে এই কালো অধ্যায়ের।

নীল চাষের পুনরুত্থান: নীলকরেরা ল্যাজ গুটিয়েছিলো প্রায় ১৫০ বছর আগে। যদিও দেশের কোথাও আজ নীলকরদের খুঁজে পাওয়া না,তথাপি রংপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় নীল চাষের দেখা পাওয়া যায় ভিন্ন আঙ্গিকে। ইংরেজরা চলে যাওয়ার পরও বহু বছর ধরে বংশ পরম্পরায় হয়ে আসছে নীল চাষ। স্থানীয়রা একে বলে মাল গাছ। এ মাল গাছই যে নীল গাছ তা অনেকেই জানত না। ২০০৫ সালে সর্ব প্রথম জানা যায়, এ গাছ থেকে প্রাকৃতিভাবে নীল সংগ্রহ করা যায়। আর ২০০৭ সালে আধা বাণিজ্যিকভাবে নীলের উৎপাদন শুরু হয় রংপুর জেলার হরকলি ঠাকুরপাড়া গ্রামের ডা. অনীল কুমার রায়ের ছেলে ডা. নিখীল চন্দ্র রায়ের হাত ধরে। রংপুর জেলার সদর, তারাগঞ্জ, গঙ্গাচড়া ও নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৩ হাজার কৃষক নীল চাষ করে আসছে। ৩/৪ বছর আগেও সেখানে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে নীলের চাষ হতো। মাঝে নীল উৎপাদনকারী কারখানা বন্ধ থাকায় এর আবাদ কমে যায়। বন্ধ কারখানা চালু হওয়ায় এখন নীল চাষে নতুন উদ্যোম সৃষ্টি ও গতি সঞ্চার হয়েছে।

নীলের চাহিদা: আমাদের দেশে উৎপাদিত ভালো মানের নীলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলোতে। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত নীলের পরিমাণ প্রায় ২০০০ কেজি। প্রতিকেজি নীলের বাজার দর ১২শ থেকে ২৫শ টাকা। সর্বোৎকৃষ্ঠ নীল প্রতিকেজি ২৫ হাজার টাকা দরেও বিক্রি হয়। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ২০১৮ সালে ৬০ হাজার মার্কিন ডলার( প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার) নীল রপ্তানী করা হয়। শুধুমাত্র ভারতেই প্রতিবছর নীলের চাহিদা ২৫০ মেট্রিক টন।

নীলের চাষঃ ফেব্রুয়ারি-মার্চ মূলত বীজ বপনের মূল সময়। অর্থাৎ আমাদের দেশে যখন পাট বপন করে তখনই নীলের বীজ বোনার সময় হয়। এক চাষ দিয়ে বীজ বপন করা হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিনা চাষেই বীজ বপন করা হয়। প্রতি একরে ৪-৫ কেজি আর হেক্টরে ১০-১৫ কেজির বীজের প্রয়োজন হয়। নীলের বীজ অনেকটা সরিষার বীজের মতো। ছিটিয়ে বপন করা হয় অনেকটা ধইঞ্চা বা পাটের বীজে মতো।

পাতা কাটা ও প্রক্রিয়জাতকরণ:
বীজ বপনের ৯০ দিন পর গাছ যখন একটু বড় হয় তখন প্রথমবার পাতা কাটা হয়। ওপর থেকে ১ দেড় ফুট শাখাসহ পাতা কেটে আনা হয়। এভাবে ১ বার কাটার পর ৬ মাস আয়ুকাল মৌসুমে অন্তত ৪-৫ বার পাতা কাটা যায়। পাতা সংগ্রহের পরও গাছের অবশিষ্ট অংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বীজের গাছ থেকে নিয়মিত পাতা সংগ্রহ করা হয় না। প্রথমবার পাতা কাটার পর বীজ গাছকে আলাদা করে যত্নআত্তি করে রাখা হয় বীজ সংগ্রহের জন্য। নীল সংগ্রহ কোনো বিশেষায়িত পদ্ধতি নয়। জমি থেকে গাছের উপরের শাখাসহ নীল পাতা সংগ্রহ করে চৌবাচ্চাতে পরিমাণমতো পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় বা জাগ দেয়া হয়। পানি এ পরিমাণে হবে যেন পাতার উপর ১ ইঞ্চি পানি থাকে। এভাবে ২০ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টা জাগে ডুবিয়ে রাখা হয়। এরপর প্রথম চৌবাচ্চা থেকে পাতা ডালপালা ছেকে শুধু নীল পানি দ্বিতীয় চৌবাচ্চােেত নেয়া হয়। পাতা ডালপালা জৈবসার কিংবা জ্বালানি হিসেবে শুকিয়ে নেয়া হয় বা জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয় চৌবাচ্চা থেকে ১ ঘণ্টা ঝাঁকানির পর প্রচুর ফেনা সৃষ্টি হয়। বর্তমানে অটোমেটিক পদ্ধতিতে পানি নাড়াচাড়া করা হচ্ছে। এরপর পরিমাণমতো কস্টিক সোডা (গোপন ফরমুলা) মিশিয়ে আবার অনবরত নাড়াচাড়া বা ঝাঁকানো হয়। কতক্ষণ পর পুরো দ্রবণকে মাঝারি আকারের ঝুড়ি নিয়ে তারমধ্যে মোটা মার্কিন কাপড় বিছিয়ে দিয়ে ছাকার জন্য ফেনাযুক্ত ঝাঁকানো দ্রবণ ঢালা হয় এবং ১ দিনের জন্য রেখে দেয়া হয়। এতে মার্কিন কাপড়ে তলানি জমা হয় আর থিতানো পানি আলাদা হয়ে যায়। মার্কিন কাপড়ের এ তলানিই নীল। ছাকা পানি গাছের গোড়ায় দেয়া হয় বা বাথরুম মেঝে পরিষ্কার করতে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়। এ পানিতে পা ডুবিয়ে রাখলে পা ফাটা বা পায়ের বিভিন্ন চর্মরোগ সংক্রান্ত সমস্যা দূর হয়। পানি ঝরে যাওয়ার পর মার্কিন কাপড় থেকে ছোট চামচের মাধ্যমে কাঁচিয়ে সংগ্রহ করা হয়। এ সেমিসলিড ভেজা শক্ত অংশ নীল রোদে শুকিয়ে দানাদার নীল তৈরি হয়। প্রথমে রোদে শুকালে নরম কয়লার মতো হয়। ১-২ দিন শুকালেই নীল শক্ত হয়। পরে গ্রাইন্ডিং মেশিনে বা হলারে বা পাটাপুতাতে পিশে গুঁড়া করে প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রি করা হয়। সাধারণভাবে প্রতি প্যাকেট নীলের দাম আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা।

নীলে বহুমাত্রিক ব্যবহার: নীল সাধারণত সব ধরনের সুতি উলেন সিল্ক টাইপের জামা কাপড়ের রঙ উজ্জ্বল ঝকঝকে চকচকে করার জন্য ব্যবহার করা হয়। একজোড়া জামাকাপড় নীল দিতে ৩ থেকে ৭ গ্রাম নীলের প্রয়োজন হয়। সাধারণ হিসাবে জানা যায়, বছরে ২ মিলিয়ন কিলোগ্রাম নীল উৎপাদিত হয়। নীলের ব্যবহার শুধু নীল হিসেবেই নয়। নীলগাছ উৎকৃষ্ট জ্বালানি এবং জৈবসার। তাছাড়া নীল দেয়া জামা কাপড় পরলে বাতাসে ভাসমান বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া থেকে শরীরমুক্ত রাখা যায় এবং এলার্জি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। নীল তেল ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়াজনিত সমস্যা থেকে শতভাগ রক্ষ পাওয়া যায়। ১ দিনের শিশু থেকে শতায়ু বছরের বয়স্কদের শরীরে অনায়াসে নীলতেল ব্যবহার করে শরীর ভালো রাখে। ডাইং ও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে বেশ আবশ্যকীয় উপকরণ হিসেবে নীল ব্যবহার আবশ্যকীয় অংশ। ইদানীং চুলে কলপ দেয়ার জন্য বেশ আয়েশিভাবে ব্যবহার বাড়ছে নীলের। নীল ব্যবহারে চামড়া ভালো থাকে, শরীরের উজ্জ্বলতা বাড়ে। নীল তেলের খৈল লোসন হিসেবে, সেভিং ফোম হিসেবে ব্যবহার দীর্ঘদিনের। দেহের ব্যথা উপশমে নীল ব্যবহৃত হয়। কেনিয়ার জনগণ নীলের ডাল দিয়ে দাঁত মাজেন দাঁতের রোগ থেকে উপশম পাওয়ার জন্য। কেউ কেউ পোকার আক্রমণ ও সাপের কামড়ে ব্যথায় বিষ কমানোর জন্য নীল ব্যবহার করেন। নীলের ওষুধ শিল্পে ব্যবহার রয়েছে বহুমাত্রিক। নীল গাছে কোনো সার দিতে হয় না। পোকা রোগে আক্রমণ তেমন করে না। বলতে গেলে কোনো যত্ননআত্তী করতে হয় না। গরু ছাগল হাঁস-মুরগি খায় না নষ্ট করে না। নীলের পরাগ রেণু মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসে শারীরিক গঠনে সহায়তা করে।

দেশের যে কোনো অনাবাদি পতিত জমিতে অনায়াসে নীল চাষ করা যায়। দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনাবাদি পতিত অনুর্বর জমি পরিকল্পিতভাবে নীল চাষের আওতায় আনতে পারলে অভাবনীয় সফলতা আসতে পারে, সৃষ্টি হতে পারে আরেকটি রপ্তানী খাতের। এছাড়াও নতুন ও বিশেষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, উত্তরাঞ্চলের ফসলভিত্তিক সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। নীল তামাকের সুবিকল্প প্রতিযোগিতামূলক ফসল হিসেবে অনায়াসে আবাদ করা যায়। ঐতিহাসিক এই নীলের স্পর্শে রঙিন হয়ে উঠুক আমাদের দেশের অর্থনীতি এ আশাটুকু ব্যক্ত করছি।

তথ্যসূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস, উইকিপিডিয়া,দৈনিক সমকাল, roar media.

Writer information:

Ahmmed Ronju
1st batch
Dr. M A Wazed Miah Textile Engineering College, Pirganj, Rangpur.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author