Home Textile Manufacturing পবিত্র কাবা শরীফের গিলাফ তৈরির ইতিহাস

পবিত্র কাবা শরীফের গিলাফ তৈরির ইতিহাস

‘কাবা শরিফের গিলাফের বাইরের কালো কাপড়ে স্বর্ণমন্ডিত রেশমি সুতা দিয়ে দক্ষ কারিগর দিয়ে ক্যালিওগ্রাফি করা হয়।’

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ হলেও মুসলিমদের কাছে পবিত্র দুটো নগরী হলো মক্কা আর মদিনা। তৃতীয় পবিত্র নগরী জেরুজালেম।মক্কা মূলত পবিত্র কাবার শরিফের কারণেই পরিচিত। কাবা শব্দের অর্থ ‘ঘনক’, ‘কিউব’। কালো ঘরটার ঘনক আকৃতির কারণেই এই নাম। চার হাজার বছর আগে এই মক্কার আশপাশের অঞ্চল ছিল জনবিরল মরুভূমি। আদি ইসলামিক সূত্র অনুযায়ী ইহুদী, খ্রিস্টান আর ইসলাম ধর্মের পিতা নবী আব্রাহাম/হযরত ইব্রাহিম (আ)-কে তাঁর স্ত্রী সারাহ ঈর্ষান্বিত হয়ে হাজেরার শিশুপুত্র ইসমাইল (আ)-কে মা-সহ চোখের আড়াল করতে অনুরোধ করেন। আল্লাহ্‌র আদেশে ইব্রাহিম (আ) ইসমাইল (আ)-কে তাঁর মা হাজেরাসহ এই মক্কার বিরান ভূমিতে রেখে আসেন, যদিও পুত্রবিচ্ছেদে তাঁর প্রচণ্ড কষ্ট হয়েছিল। সেখানে বুখারি শরিফ মতে ফেরেশতা জিবরাঈলের (আঃ) ডানার আঘাতে ‘জমজম’ কূপ সৃষ্টি হয়। বিরান মরুর বুকে পানির সন্ধান পেয়ে ঐ এলাকায় লোক জড়ো হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে এই জায়গায় লোকালয় গড়ে ওঠে। ইসমাইলের নামানুসারে এই জনগোষ্ঠীকে বলা হত ইসমাইলাইট/ইসমাইলি। হযরত ইসমাইল (আ) তাদের কাছেই আরবি শেখেন, যেহেতু তাঁর মাতৃভাষা আরবি ছিল না। ইসলামি সূত্র মতে, ইসমাইল বড় হবার পর হযরত ইব্রাহীম (আ) মক্কায় আসেন এবং আল্লাহ্‌র আদেশে এখানে কাবার নির্মাণ শুরু করেন পুত্রের সাথে।

▪ কাবার গিলাফ:

পবিত্র কাবা শরিফের কালো গিলাফ। যাকে কিসওয়া বলা হয়। কালো গিলাফে আবৃত কাবা শরিফ মুসলিম উম্মাহর আবেগ-অনুভূতির সর্বোচ্চ স্থান। এ কালো গিলাফ যেন পবিত্র কাবা শরিফকে অপার্থিব গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে আছে। পবিত্র কাবা শরিফকে ঘিরে রাখা এ গিলাফের আর্ট ও সোনার সুতায় বোনা ক্যালিওগ্রাফি মুমিন মুসলমানের হৃদয়ে তৈরি হয় ভালোলাগা, ভালোবাসা ও অনুভূত হয় অন্যরকম এক মায়াবি আকর্ষণ।

কবে থেকে কাবা শরিফে গিলাফ ব্যবহৃত হয় তার সুস্পষ্ট ইতিহাস জানা না গেলেও একসময় কাবা শরিফের বাইরের মতো ভেতরেও গিলাফে আবৃত করা হতো কাবার দেয়াল, যা এখন করা হয় না।

▪ কিসওয়াহ বা গিলাফ দিয়ে আচ্ছাদনের ইতিহাস:

কাবাঘরকে গিলাফ দিয়ে আচ্ছাদন কখন বা কার উদ্যোগে শুরু হয় সেই সম্পর্কে মতভেদ আছে। একটি ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয়েছে, হজরত ইসমাঈল (আ.) প্রথম পবিত্র কাবাঘরকে গিলাফ দিয়ে আচ্ছাদন করেন। ভিন্ন আরেকটি বর্ণনায় আছে, মহানবীর (সা.) পূর্বপুরুষ আদনান ইবনে আইদ পবিত্র কাবাঘরকে প্রথম গিলাফ দিয়ে আচ্ছাদিত করেন। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হিমিয়ারের রাজা তুব্বা আবু কবর আসাদই পবিত্র কাবাঘর গিলাফের মাধ্যমে আচ্ছাদনকারী প্রথম ব্যক্তি।

‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়েও পবিত্র কাবা শরিফে গিলাফ ব্যবহৃত হতো না। কাবাঘরে গিলাফ ব্যবহারে সঠিক তারিখ জানা না গেলেও পবিত্র নগরী মক্কা ও তায়েফে প্রাপ্ত শিলালিপিতে খচিত আরবি ক্যালিওগ্রাফি সূত্রে জানা যায় যে, ৪০ হিজরি সনের দিকে আরবি ক্যালিওগ্রাফি উন্নত স্টাইল তখন অধিক প্রচলিত ছিল।’

▪ সুন্দর কাপড়ে গিলাফ:

বর্তমান সময়ে যে স্টাইলের আদলেই পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফে সোনার সুতায় আরবি ক্যালিওগ্রাফি খচিত হচ্ছে।মিসরের মামলুক সালতানাতের আমলে কাবার ভেতর ও বাইরে আলাদাভাবে গিলাফে আবৃত করা হতো এবং তাতে আরবি ক্যালিওগ্রাফি দিয়ে অলঙ্কৃত করা হতো। ৭৬১ হিজরিতে মামলুক আমলের সুলতান নাসের হাসান বিন মুহাম্মদ বিন কালাউনের সময় কাবার ভেতরের ক্যালিওগ্রাফি খচিত গিলাফের একখণ্ড এখনও সংরক্ষিত আছে।

তবে কাবার গিলাফের ভেতর-বাইরে উভয় অংশে শৈল্পিক এবং নয়নাভিরাম ক্যালিওগ্রাফির অলঙ্করণ শুরু করেন তুর্কি উসমানিয় সুলতানরা। তাদের সময়ে ক্যালিওগ্রাফির সবচেয়ে নান্দনিকশৈলী সুলুস ও জালি সুলুসের ব্যবহার শুরু হয়।

মামলুক সুলতানদের সময়ে রায়হানি ও মুহাক্কাকশৈলীর কায়রো ধারায় ক্যালিওগ্রাফি ব্যবহৃত হতো। তবে কাবার চারপাশে মসজিদে হারামে কুফি কাইরোয়ানি, জাহরি-নাবতি লিপির অলঙ্করণ ছিল। ১৩৪৬ হিজরিতে কাবা শরিফের গিলাফ তৈরিতে বিশেষ কারখানা তৈরির বিষয়টি সামনে আসে এবং তৎকালীন সৌদির বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল-সৌদের নির্দেশ ক্রমে গিলাফ বা কিসওয়া তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৩৪৬ সালে ওই কারখানা নির্মিত অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ক্যালিওগ্রাফিতে সজ্জিত কালো গিলাফ দ্বারা আবৃত করা হয় পবিত্র কাবা শরিফ। বিশ্ববিখ্যাত ক্যালিওগ্রাফারদের এক সম্মেলন আহ্বান করা হয়। সেখানে সুলুসলিপিতে গিলাফ অলঙ্কৃত করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

ঝারনিখ কালি দিয়ে প্রথমে কাপড়ে ক্যালিওগ্রাফির আউটলাইন দেয়া হয়, তারপর কারিগররা হরফের ভেতর রেশমি সুতার মোটা লাইন বসিয়ে স্বর্ণের সুতা দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে হরফ ফুটিয়ে তোলেন। গিলাফের কালো জমিনে স্বর্ণের সুতার ঢেউ খেলানো বুননের ক্যালিওগ্রাফির সোনালি আভা এক জান্নাতি আবেশ ছড়িয়ে দেয়।
চার কোনায় সৌন্দর্যবর্ধন করে বৃত্তাকারে লেখা থাকে সুরা ইখলাস। রেশমি কাপড়ের নিচে দেওয়া হয় মোটা সাধারণ কাপড়। একটি গিলাফে ব্যবহৃত রেশমি কাপড়ের ওজন ৬৭০ কিলোগ্রাম ও স্বর্ণের ওজন ১৫ কিলোগ্রাম। নতুন গিলাফ তৈরি করতে ১২০ কেজি সোনার সুতা, ৭০০ কেজি রেশম সুতা ও ২৫ কেজি রুপার সুতা লাগে।- গিলাফটির দৈর্ঘ্য ১৪ মিটার এবং প্রস্থ ৪৪ মিটার।- গিলাফের সেলাই কাজে অংশগ্রহণ করে দেড় শতাধিক অভিজ্ঞ দর্জি।- গিলাফ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় বিশেষ মেশিন।

উল্লেখ্য, সোনা ও রুপা নির্মিত সুতা দ্বারা কালো সিল্কের কাপড়ের ওপর কুরআনুল কারিমের আয়াত অঙ্কনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। কাবা শরিফের গিলাফ তৈরির পর তা বিশেষ বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়ায় তাপ দেয়া হয়। যাতে তা প্রচণ্ড রোদ ও তাপের কারণে অবিকৃত থাকে। কাবাঘরের গিলাফ তৈরির কারখানাটি মক্কা নগরীর উম্মুল জুদ এলাকায় অবস্থিত। বর্তমানে এটি তৈরিতে ১ কোটি ৭০ লাখ সৌদি রিয়াল ব্যয় হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৮ কোটি ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৪ টাকা।

▪ বর্তমান কাবা শরীফের গিলাফ তৈরির কারখানা:

বাদশাহ আবদুল আজিজ ক্ষমতায় আসার পরে পবিত্র কাবা শরীফের গিলাফ তৈরি করার জন্য একটি আধুনিক কারখানা স্থাপনের প্রয়োজন বোধ করেন এবং কাবা শরীফের গিলাফ তৈরির জন্য ১৯২৬ সালে মক্কা শহরের অদূরে “ king Abdul Aziz Complex” নামক একটি কারখানা স্থাপন করেন।

▪ গিলাফ তৈরির ধাপ:

কিসওয়া পাঁচ ধাপে বানানো হয়। প্রথমে কাঁচা রেশম উপাদানকে সাবান মিশ্রিত গরম পানিতে ২৪ ঘণ্টা ডুবিয়ে রাখা হয়। এতে রেশমের ঔজ্জ্বল্য বাড়ে। এরপর তা কালো অথবা সবুজ রঙে ডোবানো হয়। তা নির্ভর করে কোন পাশের বা কাবার কোন অংশের কিসওয়া তার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে সেলাইয়ের জন্য যে সুতা ব্যবহার করা হবে, তা-ও এতে দেওয়া হয়, যাতে কাপড় ও সুতার রং একই হয়। কাপড় ও সুতা প্রস্তুত হওয়ার পর শুরু হয় বুননের কাজ। প্রথম দিকে পুরোটাই হাতে বোনা হতো। তবে বর্তমানে এই অংশটুকু মেশিনের সাহায্যে বোনা হয়। হাতের কাজটুকু শেষাংশে থাকে। হাতের কাজ শেষ হওয়ার পর কাপড়ের ওপর পবিত্র কোরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি প্রিন্ট করা হয়। চতুর্থ অংশটিই হচ্ছে সবচেয়ে দীর্ঘ আর কষ্টকর। এই ধাপে এসে সব লেখা সোনা-রুপা মিশ্রিত সুতা দিয়ে লেখা হয়। প্রথমে হলুদ ও সাদা সুতা দিয়ে ‘লেখার অংশের ভিত্তি’ তৈরি করা হয়। এর ওপর সোনা-রুপার তার বা সুতা দিয়ে একে আবৃত করা হয়। কাপড় থেকে এর উচ্চতা প্রায় দুই সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। আর এ জন্যই এটি মেশিনের সাহায্যে করা সম্ভব নয়। এরপর বিভিন্ন অংশ জোড়া দেওয়া হয়।

তথ্যসূত্র: Jagonews24, Bangla tribune, Roar media.

Writer information:

Sajjadul Islam Rakib
Campus Ambassador-TES
NITER (10th Batch)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author