Home Business বস্ত্রখাতের দুঃসময়ে বায়াররা কেমন ভূমিকা পালন করছে?

বস্ত্রখাতের দুঃসময়ে বায়াররা কেমন ভূমিকা পালন করছে?

করোনা শুধু একটি প্রাণঘাতী মহামারী নয় বরং পুরো পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দেয়া এক ভয়াবহ থাবার নাম। এই মহামারী শুধু মানুষের প্রাণ নিয়েই থেমে থাকে নি, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে করে দিয়েছে স্থবির । করোনার থাবায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত যে শিল্পটি সেটি হচ্ছে পোশাকশিল্প। বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হচ্ছে পোশাকশিল্প। দেশের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেয়ার পাশাপাশি অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে এই খাত। কিন্তু করোনার কারণে এই খাত আজ ভয়াবহ হুমকির মুখে। চীনকে বলা হয় সারা বিশ্বের কারখানা। কিন্তু তৈরি পোশাকের বেলায় বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ক্যাম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং মিয়ানমার পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ লাখ। গত বছর বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে। যদি ইউরোপ বা আমেরিকার যে কোন শহরে প্রাইমার্কের যে কোন স্টোরে ঢুকে যে কোন একটি পোশাক হাতে তুলে নেন, এমন সম্ভাবনাই বেশি যে সেটি বাংলাদেশে তৈরি। রেডিমেড গার্মেন্টস (RMG) রপ্তানিতে চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। সারাবিশ্বের বিভিন্ন ছোট-বড় নামিদামি ব্রান্ড, বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি করে। যাদেরকে আমরা বলে থাকি ‘বায়ার’। পুরো পৃথিবী এখন লকডাউন, তাই মানুষ এখন ঘরবন্দী। এমতাবস্থায় মানুষের বিভিন্ন জিনিসের চাহিদা কমে গেছে শুধুমাত্র খাদ্যপণ্য এবং ঔষধপণ্য ব্যতিত। চাহিদা কমে যাওয়ার মধ্যে পোশাক পণ্যওরয়েছে। ফলে পোশাক বিক্রি অনেক পরিমাণে কমে গেছে । এজন্য বেশির ভাগ কোম্পানির এখন আর পোশাক আমদানি বা ক্রয় করার দরকার নেই। তাই তারা তাদের ক্রয়াদেশ বাতিল করছে। যার ফলে আমাদের পোশাকখাত হুমকির মুখে পড়েছে।

পরিসংখ্যান:

এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১৫০টি কারখানায় ৩১৮ কোটি ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছে। এর ফলে সরাসরি ক্ষতির শিকার হবে ২২ লাখ শ্রমিক। গত ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিলো। চলতি অর্থ বছরে প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ২ হাজার ৪১০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে।এটি গত অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ১২ শতাংশ কম। গত এপ্রিল মাসে ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। পরিমানটি কতটা কম তা বোঝার জন্য ২০১৯ এর এপ্রিল মাসের দিকে চোখ রাখতে হবে। ২০১৯ এর এপ্রিল মাসে রপ্তানি হয়েছিলো প্রায় ২৪২ কোটি ডলারের পোশাক। সেই হিসেবে গত মাসে পোশাক রপ্তানী কমেছে ৮৪ শতাংশের বেশি এবং যদি তুলনা করা হয় ২০২০ এর মার্চ মাসের সাথে এপ্রিল মাসের অর্থাৎ মাত্র ১ মাসের ব্যবধানে পোশাক রপ্তানী কমে গেছে ১৮৮ কোটি ডলার।

স্বস্তির নিঃশ্বাস:

আশার খবর হচ্ছে করোনার এই সময়ে উৎপাদিত বা সরবরাহ করা পোশাকের কোন ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করলে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ক্রয়াদেশের FBO ( ফ্রেইড অন বোর্ড) মূল্যের শতভাগ পরিশোধ করতে বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে স্টার নেটওয়ার্ক। উল্লেখ্য স্টার নেটওয়ার্ক হচ্ছে এশিয়ার ছয় দেশের পোশাক,বস্ত্র, হোসিয়ারি ও টাওয়াল উৎপাদনও রপ্তানি কারক প্রতিষ্ঠানের নয়টি ব্যবসায়িক সংগঠনের জোট। কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। পোশাক শ্রমিকদের জন্য ১টি তহবিল গঠন করেছে যার অর্থ পাবেন বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া,ভারত,মিয়ানমার শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামের শ্রমিকেরা।

পুরনো অর্ডার:

পুরনো অর্ডার আছে অন্তত ৪ বিলিয়ন ডলার। পুরনো অর্ডার যাতে হাতছাড়া না হয়, সেজন্য সব কারখানা খুলতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিকেএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যেসব অর্ডার এখনও বহাল আছে সেগুলো ঠিক রাখতে কারখানা চালু করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতি মাসে গড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারেরঅর্ডার থাকে। এপ্রিল, মে, জুন ও জুলাই এই চার মাসের অর্ডার থাকার কথা ১২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৮ বিলিয়ন ডলার বাতিল হয়েছে। বাকি ৪ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার এখনও ক্রেতারা অব্যাহত রেখেছে। 

সুইডিশ প্রধাণমন্ত্রীর আশ্বাস:

সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী স্ট্যাফেন লোফভেন নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশে কাছে দেওয়া তৈরি পোশাকের কোন অর্ডার বাতিল করবে না তার দেশ। ফোনালাপে স্ট্যাফেন লোফভেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কে বলেন, আমার দেশ বাংলাদেশে থেকে তৈরি পোশাক আমদানি চালিয়ে যাবে।

ডাচ ক্রেতাদের আশ্বাস:

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে নেদারল্যান্ডসে মোট পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে প্রায় ৯৮৬ দশমিক ৯৩ ডলার। আগ থেকেই বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে খুব ভালো বাণিজ্য সম্পর্ক বিরাজ করছে। নেদারল্যান্ডস নিশ্চিত করেছে যে বিশ্বব্যাপী COVID-19 প্রভাবে ডাচ ক্রেতারা বাংলাদেশী পোশাক কারখানা থেকে কোনো অর্ডার স্থগিত করবেনা। নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক ওবাণিজ্য মন্ত্রী Sigrid Kaag বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এই আশ্বাসপ্রদান করেন।

দেশীয় প্রতিষ্ঠান গুলির ভূমিকা:

ADAM APPARELS:

অ্যাডাম অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুল হক মুকুল জানান, তার কারখানায় আগামী শীত মৌসুমের উপযোগী পোশাকের দুটি রপ্তানি আদেশ পেয়েছেন। আয়ারল্যান্ডের আরও কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে তার কথা হচ্ছে। তিনি জানান, করোনার ঘটনায় চীনের প্রতি সারাবিশ্বের নেতিবাচক মানসিকতা তীব্র হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এটা একটা বড় সুযোগ। স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারলে এই সুযোগে বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। বিশ্বব্যাপী করোনার সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর (পিপিই) বড় বাজার তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। নিজের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত সপ্তাহে ফ্রান্সের একটি বিখ্যাত ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে দেড় লাখ পিস পিপিই সরবরাহ করেছেন তিনি।

TEX WEB:

টেক্স ওয়েভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিকুর রহমান তুহিন জানান, জার্মানি সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছোট শোরুম খুলে দেওয়া হয়েছে গত সপ্তাহে। এরপর সেখানে অবিশ্বাস্য রকম বিক্রি হচ্ছে। এতে শোরুমে পোশাকের টান পড়েছে। চাহিদা তৈরি হওয়ায় ক্রেতারা আবার ফিরতে শুরু করেছেন। নেদারল্যান্ডসেও একই অবস্থার কথা জানিয়েছেন তার ক্রেতারা। এই সুবাদে নতুন করে রপ্তানি আদেশ পেয়েছেন তিনি। তিনি আরও জানান, শীতের নতুন মৌসুমের রপ্তানি আদেশ এবার আগাম পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এখনো ব্যাপক হারে রপ্তানি আদেশ না এলেও আগামী কয়েক সপ্তায় অনেক বেশি হারে রপ্তানি আদেশ পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, পিপিইর পাশাপাশি নানা রকম ফ্যাশনেবল মাস্ক যুক্ত হয়েছে নতুন রপ্তানি পণ্যের তালিকায়।
বিশ্বখ্যাত ব্র‍্যান্ডগুলো নিয়ে পর্যালোচনাঃ

H&M:

H&M ২ মার্চ নিম্নরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যে, তারা ইতিমধ্যে উৎপাদিত পোশাক এবং উৎপাদনের পণ্য সরবরাহ করে আমাদের পোশাক উৎপাদন সরবরাহকারীদের প্রতি আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াব। আমরা এই পণ্যগুলির জন্য অর্থ প্রদান করব।

Primark:

মহামারীর ক্রান্তিলগ্নে Primark পোশাক শিল্পকে আশাহত করলেও পরবর্তীতে তারা জানায় বাংলাদেশ সহ ১২ টি পোশাক রপ্তানী কারক দেশে ৩৭০ মিলিয়ন ডলার প্রণোদনা দিবেন। 

ASDA STORES/GEORGE UK:

প্রথমদিকে অর্ডার বাতিল করলেও পরবর্তীতে বিবিসি কে ASDA জানায় এখনো যেসব অর্ডারের কাজ শেষ হয়নি সেগুলোর ৩০% মূল্য প্রদান করবে তারা। তাছাড়া যেসব অর্ডার সম্পন্ন হয়েছে সেগুলোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্ধেক মূল্য প্রদান করবে।

M&S, PVH, IndiTex, Kaibi, Target:

সমুদ্রের মধ্যে যে পণ্যগুলি চালিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত এবং প্রগতিতে চলছে তা নিয়ে যাওয়ার নিশ্চিত করেছে বিশ্বখ্যাত ব্র‍্যান্ডগুলো। খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে তিনটি ইইউ এর এবং বাকি দুটি উত্তর আমেরিকার।
আশা করি, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। ততক্ষণ পর্যন্ত নির্মাতাদের বেঁচে থাকার জন্য ব্র্যান্ড এবং ক্রেতাদের প্রাথমিক সহায়তা প্রয়োজন।

লেখাটি লিখতে যেসব সোর্স ব্যাবহার করা হয়েছেঃ Google , bbc.com, Textile Today, BGMEA,BKMEA, The Financial Express, RTV News, প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ.

Writers information:

1. Md Rafi (DWMTEC)
2. Ashadulla Rabbul (PCIU)
3. Sajjadul Islam Rakib (NITER)
4. Arafat Khan Pritom (DWMTEC)
5. Nahida Akter Tonima (BUFT)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author