Home Fabric স্পাইডার সিল্ক: এক অসাধারণ প্রাকৃতিক ফিলামেন্ট ও এর ভবিষ্যৎ

স্পাইডার সিল্ক: এক অসাধারণ প্রাকৃতিক ফিলামেন্ট ও এর ভবিষ্যৎ

আমরা সকলেই জানি যে, সিল্ক হচ্ছে প্রকৃতিতে প্রাপ্ত একমাত্র কন্টিনিউয়াস ফিলামেন্ট। সাধারণত, রেশম পোকা হতে সিল্ক পাওয়া যায় এবং এসব পোকা বিশ্বের সবচেয়ে সেরা ও উজ্জ্বল সুতা উৎপন্ন করে থাকে। তবে, রেশম পোকাই সিল্কের একমাত্র উৎস নয়। প্রকৃতির আরো বেশ কিছু উৎস থেকে সিল্ক উদ্ধৃত করা হয়। কিন্তু একটি প্রধান সমস্যা হলো এ সমস্ত উৎস হতে অতি সহজে সিল্ক সংগ্ৰহের উপযুক্ত পন্থা নেই।

সিল্ক একটি প্রোটিন-ভিত্তিক প্রাণিজ ফাইবার;যা প্রধাণত রেশম গুটি থেকে বিশেষ কিছু প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংগ্ৰহ করা হয়। যদিও এধরনের সিল্ক ও এর উৎপাদন প্রক্রিয়াগুলো প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে, একই সময়ে একটি বিশেষ প্রজাতির মাকড়সা রেশম উৎপন্ন করতেও সক্ষম। মূলত, বেশির ভাগ মাকড়সাই রেশম উৎপাদনে সক্ষম, তবে বিশেষ করে “Golden Orb” প্রজাতির মহিলা মাকড়সা বিশেষ একধরনের সোনালী রেশম তৈরিতে সক্ষম। এছাড়া নিচু প্রজাতির মাকড়সাও সিল্ক ফিলামেন্ট তৈরি করে থাকে।

গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য:

টেক্সটাইল শিল্পে ব্যবহারের জন্য, ফাইবার বা ফিলামেন্টের বেশকিছু বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক।যেমন: প্রবলতা, ঔজ্জ্বল্য, নমনীয়তা ইত্যাদি। রেশম পোকার ক্ষেত্রে উক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি বেশ সন্তোষজনক এবং এটি তার চাকচিক্যতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। উক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি বিবেচনায়, মাকড়সার রেশম একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে।

এ রেশমগুলো অন্যান্য প্রাকৃতিক ফাইবারের চেয়ে ভালো স্থিতিস্থাপকতা প্রদান করে থাকে। এটি তার স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যের প্রায় ৪০% পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে। তাছাড়া টেনসাইল শক্তির বিবেচনায়, মাকড়সা হতে প্রাপ্ত সিল্ক স্টিলের তুলনায় অবিশ্বাস্যরকম শক্তিশালী এবং কেভলারের চেয়ে অধিক শক্ততর হয়ে থাকে।

No description available.

গবেষণা ও এর সাম্প্রতিক বিকাশ:

যেমনটি আমরা জানি, স্পাইডার সিল্ক মাকড়সা হতে উদ্ধৃত করা হয়ে থাকে। আরো স্পষ্ট করে বলতে, বিশেষ একধরনের মাকড়সা হতে উদ্ধৃত করা হয়। তাই প্রাকৃতিক মাকড়সার সিল্ক সংগ্ৰহ এবং সংশোধন করা ততোটা সহজসাধ্য নয়। কিন্তু, অপরদিকে টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদনে এর দুর্দান্ত কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে, গবেষকেরা মাকড়সার রেশমের ডি.এন.এ কিভাবে প্রতিলিপিত করা যায় সেবিষয়ে কাজ করছে।কেননা, এটি একাধারে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্থিতিস্থাপক। তাই গবেষকেরা বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন এবং এ উপাদানটিকে চিকিৎসা ও শিল্পের মতো নানা ক্ষেত্রে প্রয়োগের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

সম্প্রতি, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক মাকড়সার রেশমের ডি.এন.এ. অনুকরণ করার চেষ্টা করছে এবং এতে উল্লেখযোগ্য ফলাফলও লাভ করেছে। যদিও তাদের মতে প্রায় ১০০% প্রতিলিপি খুব সহজেই তৈরি করা সম্ভবপর নয়। তবে তারা এমন একটি উপাদান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যাতে মাকড়সার রেশমের মতো প্রায় একই রকম শক্তি, প্রসারনশীলতা ও বাহ্যিক বল শোষণ ক্ষমতা বিদ্যমান।

উপাদানটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি মূলত ৯৮% জল; যা হাইড্রোজেল এর সাথে ২% সিলিকন ও সেলুলোজ দিয়ে তৈরি। এই রেশম অনেক বেশি শক্তি শোষণ করতে পারে। আমরা জানি যে, যখন কোনো মাছি বা পাখি এদের জালে আঘাত করে, তখন সেই আঘাত শোষণ করা প্রয়োজন পড়ে। অন্যথায়, জালটি ভেঙে যেতে পারে। তাই, শোষণের এক্ষমতা অত্যন্ত জরুরি। আর এ জাতীয় বৈশিষ্ট্যগুলির জন্য, রেশমটি সুরক্ষা প্রতিরোধী বা প্রতিরক্ষামূলক সামরিক পোশাকের ন্যায় প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, গবেষকেরা তাতে এখনো সফল হতে পারেনি।

কেননা, মাকড়সা হতে প্রাপ্ত রেশমের নির্যাস মূলত তরল প্রোটিন। যা মাকড়সার পেটের বিশেষ এক গ্ৰন্থিতে উৎপাদিত হয় এবং পরবর্তীতে প্রোটিনের আণবিক কাঠামোটিকে পুনরায় সজ্জার জন্য বিভিন্ন রকমের মেকানিক্যাল প্রসেস প্রয়োগ করে এটিকে শক্ত রেশমে পরিণত করা হয়।

ব্যয়বহুল হওয়ার কারণসমূহ:

পোশাক বা‌ অন্যান্য টেক্সটাইল উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক রেশম ওতটা সহজলভ্য না হলেও, এর বেশ চাহিদা রয়েছে। একটি টেক্সটাইল ফেব্রিক সিল্ক দ্বারা যেকোনোরূপে তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু, ফেব্রিক বুননের জন্য প্রায় ১০ লক্ষ বুনো‌ মাকড়সার সিল্ক ব্যবহার করা হয় এবং রেশম সংগ্ৰহ ও ফেব্রিক বুনতে প্রায় ৪ বছর সময় লাগে। প্রায় ৭০ জন স্পাইডার হ্যান্ডলার (মাকড়শা সংগ্রহকারী), “Golden Orb” মাকড়সা সংগ্ৰহের সাথে জড়িত। অন্যদিকে, ১২ জন‌ লোক ফেব্রিক বুননের কাজে নিয়োজিত থাকে।

এই লোকেরা প্রতিটি মাকড়সা থেকে প্রায় ৮০ ফুট রেশম তৈরি করে থাকে। এ প্রকল্পের সহ-নেতৃত্বাধীন ছিলেন টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞ “সাইমন পিয়ার্স”। তিনি বিখ্যাত টেক্সটাইল মেশিন ডিজাইনার ”ফাদার জ্যাকব পল কম্বৌয়ের” নকশাকৃত মাকড়সার সিল্ক উত্তোলনের মেশিন ব্যবহার করেন। তাদের মতে, প্রায় ১৪ হাজার মাকড়সা এক আউন্স সিল্ক উৎপাদন করতে পারে এবং ফেব্রিকটি ওজনের প্রায় ২.২৬ পাউন্ডের হতে পারে।

অসুবিধা:

উচ্চ শক্তি সম্পন্ন, উজ্জ্বলতা এবং স্থিতিস্থাপকতার মতো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি শিল্প ও বানিজ্যিক ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুর্ভাগ্যক্রমে, এর মূল সমস্যাটি হচ্ছে, মাকড়সা‌ থেকে রেশম বের করার কোনো ভালো উপায় নেই। তাছাড়া, মাকড়সাগুলো সাধারণত স্বজাতিগ্ৰাসী (নিজেরাই নিজেরদেরকে খেয়ে ফেলে)। এগুলো রেশম পোকার ন্যায় অনেকগুলোকে একসাথে লালন-পালন করা যায়না। কারণ, একত্রে পালনের ক্ষেত্রে এরা একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়। তাছাড়া, মাকড়সা হতে প্রাকৃতিকভাবে রেশম উৎপন্ন করে তা সংগ্ৰহ করার জন্য আমাদের এর সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, “Golden Orb” মাকড়সাগুলো বর্ষাকালে রেশম উৎপাদন করে থাকে। তাই, এ জাতের মাকড়সাগুলো জুন থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে সংগ্ৰহ করতে হয়। কিন্তু, এতেও বেশ কিছু সমস্যাও রয়েছে। কিছু কিছু মাকড়সা অনেক বিষাক্ত হয়ে থাকে এবং এরা কামড়েও দিতে পারে।

সুতরাং, মাকড়সা সংগ্ৰহে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে। অন্যদিকে, রেশম একবারে এতো বেশি সংরহও করা যায় না। মাকড়সার ক্ষেত্রে রেশম পুনর্জাতকরণে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লেগে যায়।

ভবিষ্যত সম্বন্ধে গবেষকদের ধারণা:

গবেষকেরা দিন দিন এ উপাদানটির সম্পর্কে আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যখন, এই মাকড়সাগুলোর জিনোম সিকোয়েন্স ডিকোড করা যাবে এবং তা ব্যাকটেরিয়ায় সন্নিবেশ করতে সক্ষম হবে, কেবল তখনই এই মূল্যবান রেশমটি উৎপাদন করা আরো সহজতর হবে। তাছাড়া মাকড়সাগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ তরল প্রোটিনকে যে পদ্ধতিতে ঘনীভূত করে, তার অনুলিপি তৈরি করা গেলে, পরীক্ষাগারে কৃত্রিম মাকড়সার রেশম তৈরি করা সম্ভবপর হবে।

যদিও এ প্রক্রিয়া বেশ সময় সাপেক্ষ আর কষ্ট সাধ্য। তবুও,বেশ কয়েক দল গবেষক পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে এ রেশম উৎপাদনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বায়োটেকনোলজির অগ্ৰগতির ফলে বর্তমানে গবেষকেরা মাকড়সার জিন বিভিন্ন অণুজীব; যেমন:ব্যাকটেরিয়া,ঈস্ট,তামাক এমনকি ছাগলের দেহে প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। যাতে বেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্যও পরিলক্ষিত হয়েছে।

জাপানের একটি বায়োমেটারিয়াল সংস্থা “স্পাইবার”; যা সিন্থেটিক মাকড়সা সিল্ক এবং অন্যান্য প্রোটিন-ভিত্তিক উপকরণ নিয়ে গবেষণা করে থাকে। ইতোমধ্যে, এ সংস্থাটি ‘গোল্ডউইন কোম্পানি’-এর সাথে একটি মাকড়সা রেশম দিয়ে তৈরি একটি জ্যাকেট তৈরি করেছে। যার খরচ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এই জ্যাকেটের দাম প্রায় ৮০,০০০ ইয়েন, অর্থাৎ, প্রায় ৭৬৮ মার্কিন ডলার।

গবেষকেরা আশাবাদী যে, খুব দ্রুতই এ রেশম তৈরির কোনো উপযোগী ও সহজতর উপায় তারা খুঁজে পাবেন। অপরদিকে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলি রেশমের সম্ভাবনা নিয়ে এত তাড়াতাড়ি কিছুই ভাবছেনা; বরং মাকড়সা হতে রেশমের ব্যাপক উৎপাদন করতে আরো প্রায় এক দশক সময় লাগবে বলে তাদের অভিমত। কিন্তু, মাকড়সার সিল্ক টেক্সটাইল শিল্পে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে আশাবাদী।

Writer Information:

Name: Md. Rafidul Amin Soeb.
Institute: Primeasia University.
Department of Textile Engineering.
Batch: 201.
E-mail: [email protected]
Phone No: 01854501395

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author

error: Content is protected !! Don\\\\\\\\\\\\\\\'t Try to Copy Paste.