Home Textile Manufacturing FLANNEL FABRIC (ফ্লানেল ফেব্রিক)

FLANNEL FABRIC (ফ্লানেল ফেব্রিক)

সৃষ্টিকর্তার নিখুঁত হাতে সাজানো এই ধরনীতে সৃষ্টির কূলকিনারা করা বড়ই কঠিন। তাই বলে কি হাত গুটিয়ে আলস্য কে আহ্বান করবে মানব সভ্যতা? না করেনি, বরং একদল উদ্ভাবনী মানুষ তাদের কর্মের সর্বোচ্চ পরিসীমা অতিক্রমের মাধ্যমে কল্যান করে আসছে মানব সভ্যতার উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করার দুর্নিবার প্রতিযোগিতায়। মানুষের সাধারণ ধারনার বাইরে গিয়ে তারা স্থাপন করছে অনন্য দৃষ্টান্ত। যে দৃষ্টান্তে আজ মানব জাতির তৃতীয় চক্ষু উদিত হবার উপক্রম যেনো ঘনীভূত হচ্ছে আরো দৃঢভাবে।মৌলিক চাহিদা গুলাের একটি যখন পােশাক তখন বলার অপেক্ষা থাকে না মানব সমাজে এর গুরুত্ব । প্রাচীন কাল থেকে নানা বিবর্তন এর মধ্য দিয়ে যেমন পরিবর্তন এসেছে মানব সভ্যতায় ঠিক তেমনি বিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তন এসেছে মানুষের চাহিদা তে সেই সাথে পােশাক ব্যাবস্থাতেও । পােশাকের রুচি সে যার যাই হােকনা কেনাে , কিন্তু সকলের কাছে। নিজের ব্যবহৃত পােশাক যে হতে হবে চমকপ্রদ এতে কমতি রাখতে চাননা কেউই।এই চাহিদা কে গুরুত্ব দিয়ে উদ্ভাবিত হয়েছে নতুন নতুন সব তন্তু , সেই সাথে উদ্ভাবিত হয়েছে হরেক রকমের আধুনিক সব ডিজাইন । একটা সময় ছিলাে যখন মানুষের কাছে পােশাক মানে ছিল শুধুই শরীর ঢাকার বস্তু কিন্তু এখন তা পরিণত হয়েছে ফ্যাসনে। নিত্য নতুন আবিষ্কারের ধারাবাহিকতা কে লক্ষ্য রেখে আজকের আলোচ্য বিষয় ” ফ্লানেল ফ্যাব্রিক “।

ফ্লানেল ফ্যাব্রিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে জানতে হবে ফ্লানেল ফ্যাব্রিকের গোড়া থেকে।ফ্লানেল মূলত একধরনের নরম বা আরামদায়ক ফ্যাব্রিক সেই সাথে সূক্ষ্মতা অন্যান্য ফ্যাব্রিক এর তুলনায় অনেক বেশি।অন্য ভাবে বলতে গেলে মূলত সূক্ষ্মতা, দৃঢ়তা ও আরামদায়কতার সম্বন্নিত রূপ হলো ফ্লানেল ফ্যাব্রিক।তবে শুরু দিকে ফ্লানেল ফ্যাব্রিক উৎপন্নর গল্পটা কিছুটা ভিন্নতর ছিলো।একটা সময় পরিত্যাক্ত উল থেকে বা নিচু মানের সুতা থেকে ফ্লানেল ফ্যাব্রিক প্রস্তুত করা হতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে গুণগত মানের কথাটি চিন্তা করা ফ্লানেল ফ্যাব্রিক তৈরি করা হয় উন্নত মানের উল, তুলা কিংবা সিন্থেটিক ফাইবার থেকে।ফলস্বরূপ বর্তমান সময়ের আরামদায়ক সাথে উন্নত মানের ফ্যাব্রিক গুলোর মধ্যে একটি হলো ফ্লানেল ফ্যাব্রিক। এর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যবে ষষ্ঠদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ফ্লানেল ফ্যাব্রিক তৎকালীন বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ সুনাম অর্জন করেছিল।পরবর্তী কালে সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ফ্রান্সে এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে জার্মানিতে পরিচিত হয়ে উঠে ফ্লানেল ফ্যাব্রিক।তবে অঞ্চল ভেদে এই ফ্যাব্রিক এর গুণগত মানের ও অনেক তারতম্য ছিলো তৎকালীন সময়ে।উদাহরণ সরূপ বলা যেতে পারে,একসময় ইংল্যান্ডে প্রস্তুতকৃত ফ্ল্যানেল ফ্যাব্রিক প্রধানত ভালো মানের উল থেকে তৈরী করা হতো। যার কারনে এ অঞ্চলের প্রস্তুতকৃত ফ্লানেল অধিকতর আরামদায়ক ও সূক্ষ্ম ছিলো।তবে বর্তমান সময়ে ফ্যাব্রিকের মানের তারতম্য হবার সুযোগ নেই।কারণ,বর্তমানে ফ্লানেল ফ্যাব্রিক প্রস্তুত এর জন্য প্রয়োজনীয় সকল উপাদান বিশ্বব্যাপী সম অনুপাতে ব্যবহার করা করা হচ্ছে ।

ফ্লানেল ফ্যাব্রিকের ইতিহাস ক্ষুদ্র পরিসরে জানবার পর এটা জানা আবশ্যক যে কি কি প্রক্রিয়ায় ফ্যাব্রিকটি তৈরি করা হয়।তাহলে জানা যাক। সচরাচর ৪ টি ধাপ অতিক্রম করেই ফ্লানেল ফ্যাব্রিক প্রস্তুত হয়ে থাকে। ধাপগুলোর বর্ণনা পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হলো।

ধাপ ১- প্রাথমিক উপাদান প্রস্তুতকরণ: প্রথমত, ফ্লানেল প্রস্তুতের জন্য প্রাথমিক উপাদান সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।প্রস্তুতকৃত পণ্যের উপরে নির্ভর করে সাধারণত প্রাথমিক উপাদান সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।উল,কটন কিংবা বিভিন্ন ধরনের সিন্থেটিক ফাইবার প্রাথমিক উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

ধাপ ২- ইয়ার্ন স্পিনিং: এই ধাপে মূলত পূর্ববর্তী ধাপ থেকে প্রাপ্ত প্রাথমিক উপাদান গুলোকে ইয়ার্ন বা সুতায় পরিণত করা হয়ে থাকে।

ধাপ ৩- কাপড় বুনন: সাধারণত তাঁত পদ্ধতিতে বা সাধারণত বুনন পদ্ধতিতেই ফ্লানেল ফ্যাব্রিক প্রস্তুত করা হয়।এক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার দেয়া হয় গ্রাহক চাহিদার উপরে।

ধাপ ৪ – ফাইনাল ট্রিটমেন্ট: ফ্যাব্রিক প্রস্তুতকরণের এই ধাপে মূলত ফ্যাব্রিকে শিখা পদ্ধতিতে প্রলেপ দেয়া হয়ে থাকে যা ফ্যাব্রিকে আরো মানসম্মত করে থাকে। তবে সব ধরনের ফাইবার থেকে প্রস্তুতকৃত ফ্লানেলে এই প্রলেপ দেয়া যায় না। যেমন, সিন্থেটিক ফাইবার থেকে প্রস্তুতকৃত ফ্লানেলে শিখা পদ্ধিতিতে প্রলেপ দিলে তা পরবর্তীতে ত্বকের ক্ষতি করে। কিন্তু উল বা কটন থেকে প্রস্তুতকৃত ফ্লানেলে এ ধরনের সমস্যা লক্ষ্য করা যায়না। তাই সহজ ভাবে বলা যায় যে উল বা কটন থেকে প্রস্তুতকৃত ফ্লানেল ফ্যাব্রিক ই ব্যবহার করার উপযোগী। তবে নানা জটিল ধাপ অতিক্রম করার মাধ্যমে সিন্থেটিক ফাইবার থেকে প্রস্তুতকৃত ফ্লানেলকে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হচ্ছে।

এবার ফ্লানেল ফ্যাব্রিক এর প্রকারভেদ সম্পর্কে জানা যাক। ফ্লানেল ফ্যাব্রিক সাধারণত অনেক ধরনের হয়ে থাকে। যেমনঃ

১। উলের ফ্লানেলঃ প্রধানত উল থেকেই প্রস্তুত করা হয়ে থাকে এ ধরনের ফ্লানেল ফ্যাব্রিক। বিশ্বব্যাপী ফ্লানেল পরিচিতি পাবার আগে থেকেই ইউরোপের দেশগুলোতে উল থেকে প্রস্তুতকৃত ফ্লানেল বেশ জনপ্রিয় ছিলো। ইউরোপীয় দেশগুলোতে শিতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাবার জন্যই এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।তবে বর্তমান সময়ে এশিয়াতেও এর প্রচুর জনপ্রিয়তা রয়েছে।

২। কটন ফ্লানেলঃ উলের বিকল্প হিসেবে কটন বা তুলা ব্যবহার করেও প্রস্তুত করা হয় ফ্লানেল ফ্যাব্রিক।বিকল্প হিসেবে কটন ফ্লানেল যাত্রা শুরু করলেও বর্তমান সময়ে উলের তুলনায় বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কটন ফ্লানেল।

৩। সিন্থেটিক ফ্লানেলঃ মূলত সিন্থেটিক ফাইবার থেকেই এ ধরনের ফ্লানেল প্রস্তুত করা হয়ে থাকে।সিন্থেটিক ফ্লানেল জনপ্রিয়তার দিক থেকে পিছিয়ে আছে এর কিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে। তবে ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমে সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সিন্থেটিক ফ্লানেল জনপ্রিয়তা পাওয়া থেকে খুব দূরে অবস্থান করছে না।

৪। সিলোন ফ্লানেলঃ প্রধানত দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় এই ফাইবার উৎপত্তি লাভ করেছে।সিলোন ফ্লালেনের বিশেষত হলো, এই ফ্যাব্রিকে কটন এবং উলের সম পরিমাণ মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।তুলনামূলক ভাবে দামী হবার কারণে সিলোন ফ্লানেল খুব বেশি জনপ্রিয় না।

৫। শিশুদের জন্য ফ্লানেল ফ্যাব্রিকঃ এই ধরনের ফ্লানেল ফ্যাব্রিক গুলো অন্যান্য ফ্লানেল ফ্যাব্রিক এর তুলনার অনেকটা নমনীয় ও আরামদায়ক হয়ে থাকে।মূলত শিশুদের ত্বকের কথা চিন্তা করেই এ ধরনের ফ্যাব্রিক প্রস্তুত করা হয়েছে।শিশুদের জন্য ব্যবহৃত ফ্লানেলে কটন এবং উলের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।ফলে ফ্যাব্রিকটি আরো আরামদায়ক হয়ে উঠে।

৬। উদ্ভিজ্জ ফ্লানেলঃ এ ধরনের ফ্যানেল ফ্যাব্রিক খুবই কম পাওয়া যায়। প্রধানত সেলুলোজ থেকে এ ধরনের ফ্লানেল ফ্যাব্রিক উৎপন্ন করা হয় বলে এর নাম দেয়া হয় উদ্ভিজ্জ ফ্লানেল। মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে বেশ জনপ্রিয় ছিলো এ ধরনের ফ্যাব্রিক। তবে বিংশ শতাব্দীতেই এটি জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে।

এতক্ষণ জানছিলাম ফ্লানেল ফ্যাব্রিক এর ইতিহাস, তৈরির প্রক্রিয়া এবং প্রকারভেদ সম্পর্কে। এবার জানা যাক ফ্যাব্রিক টির ব্যবহার সম্পর্কে। ফ্লানেল ফ্যাব্রিক মূলত পোশাক হিসেবেই অধিক পরিচিত। পোশাকের মধ্যে শার্ট, মেয়েদের সেলোয়ার (সীমিত আকারে প্রস্তুত করা হয়), মাফলার, কানঢাকা টুপি, বাচ্চাদের সয়েটার, বাচ্চাদের জামা, চাদর, জ্যাকেট, মেয়েদের ব্যাগ-পার্স, ইসলামিক দেশগুলোতে ছেলেদের পাঞ্জাবি, কম্বল, বিছানার গরম চাদর সহ অনেক রকমের আকর্ষণীয় পোশাক এ ব্যবহার করা হয় ফ্লানেল ফ্যাব্রিক। ফ্লানেল মূলত গরম কাপড় হওয়াতে শীত প্রধান দেশগুলোতে এর কদর তুংগে।এছাড়াও শীত মৌসুমে বিশ্বব্যাপী অনেক দেশে ব্যাপকতা রয়েছে ফ্লানেল ফ্যাব্রিক এর।

বিজ্ঞানের জাদুর ছােয়ায় আজ আমরা এমন কিছু দূর্লভ বস্তুকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যে পরিণত করেছি। যাকিনা কল্পনাতীত । টেক্সটাইল গবেষক গণ দিনের পর দিনের উদ্ভাবন করে আসছে মানব সভ্যতার জন্য অকল্পনীয় সব টেক্সটাইল সামগ্রী যা পােশাকের জগতে এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা।সময়ের পরিক্রমায় পােশাক শিল্প উত্তর উত্তর সমৃদ্ধ সেই সাথে বৈচিত্র্যময় হয়ে বিরাজমান হবে এই ধরনীতে এটিই মূখ্য চাওয়া সকলের ।

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া

লেখক:

মুনতাসির রহমান
Department Of Textile Engineering
Batch:201
BGMEA UNIVERSITY OF FASHION AND TECHNOLOGY

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author