ঐতিহ্যের রোশনাই মসলিন

0
563

বাংলার শিল্প, ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সর্বপোরি কারিগরি সূচারুতার মেলবন্ধন বাংলাদেশের পোষাক শিল্প। বাংলাদেশি কাপড়ের পড়তে পড়তে লুকিয়ে আছে যেমন ঐতিহ্যের ইতিবৃত্ত তেমনি ঠাসা বুননের জালে আটকে গেছে যেনো বাংলিয়ান নিপুন আবেগ এবং স্বপ্নের মিশেল। ঢাকাই মসলিন জামদানি, রাজশাহী সিল্ক কিংবা মিরপুরের বেনারসি শৈল্পিক অভিজাত্যের যেরুপ অনুপম গুণাগুণ মানেও ততোধিক আকর্ষণীয় এবং ঐতিহ্যের। এগুলোর সমাদর শুধু বাংগালিদের ঘরে ঘরে না বরং বিশ্বব্যাপী সবত্র এর জয়ধ্বনী। এই লিখনীর সম্পূর্ণ নির্যাস ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশী বস্ত্র মসলিন কাপড় এবং রং সুতোর গল্পের প্রতিচ্ছবি।

প্রাচীন বাংলায় সমৃদ্ধ ইতিহাস আর ঐতিহ্যের যে নামটি অভিজাত্য আর নিজস্ব মহিমা নিয়ে জলজল করতেছে তা হলো মসলিন। মসলিন বিশেষ এক প্রকার তুলোর আশ থেকে প্রস্তুতকৃত সুতা দিয়ে বয়ন করা একপ্রকার অতি সূক্ষ কাপড় বিশেষ। এটি ঢাকায় মসলিন নামে পরিচিত। ফূটি কার্পাস নামক তুলো দিয়ে মসলিন প্রস্তুত করা হতো।

মসলিন খুবই সুক্ষ্ম এবং মিহি কাপড়। কোন সুতার সূক্ষ্ম তা বিচার করা হয় তার কাউন্ট নম্বর দিয়ে। যে সুতোর কাউন্ট যত বেশি সে সুতা ততো বেশি সূক্ষ্ম। এখন যে সূক্ষ্মতম বস্ত্র বানানো হয় তার কাউন্ট নম্বর বড়জোর ১২০ কিং ম্বা ১৫০ পর্যন্ত উঠানো যায়। কিন্তু সে কালে সবচেয়ে মোটা মসলিন কাপড়ের কাউন্ট ছিল ৩০০!!
এর নিচে কোন মসলিন উৎপাদিত হতো না। তাহলে বুঝুন কি রকম মিহি আর মোলায়েম ছিল এই মসলিন।
৪০ হাত লম্বা ২ হাত চোড়া কাপড় আনায়াসেই একটি আংটির মধ্যদিয়ে গলিয়ে নেওয়া যেতো। কথিত আছে বণিকের ঝিনুকের ভেতরে শত শত গজ মসলিন কাপড় আনা নেওয়া করতেন। ১৭৫ গজ লম্বা কাপড় একত্রে করলে হত এক কবুতরেত ডিমের মতো!! সব থেকে উন্নত মানের মসলিনের কাউন্ট ৭০০-৮০০ কাউন্ট।

✅ মসলিন শব্দটির উৎপত্তি: মসলিন শব্দটির উৎপত্তি উৎস সম্পর্কে বেশ অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, ইরাকের ট্রাইগিস নদীর তীরে মূসল নামক এক স্থানে এরকম সূক্ষ্ম কাপড় তোরী হতো। এই মূসল ছিল ইরাকের বিক্ষ্যাত ব্যাবসা কেন্দ। এই ‘মূসল’ এবং ‘সূক্ষ্ম কাপড়’ এই দুয়ের যোগসূত্র মিলিয়ে ইংরেজী নাম দেন ‘মসলিন’। আবশ্য বাংলার ইতিহাসে মসলিন বলতে বোঝানো হয় তৎকালীন ঢাকা এবং তার পাশ্বপার্তী অঞ্চলে উৎপাতিত মসলিন কাপড়কে।

✅ উৎপাদন প্রনালী: আগেই বলেছি এই কাপড় অতি সূক্ষ্ম। দূরথেকে দেখলে মনে হয় কুয়াশা। এই বিলাশী বস্ত্রের উৎপাদন কৌশল ছিল সেই রকম কায়দাকর। এই মসলিনের বুনন কৌশলে আবহাওয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। খুব আদ্রতাপূর্ণ স্থানে সুতো কাটতে হতো। সময় হিসেবে ভোর বেলা বেছে নেওয়া হতো। কারন দিন বাড়লে বাতাসেত আদ্রতা কমে যাওয়ায় এসুতা কাটা সম্ভব হত না। নৌকায় করে মাঝ নদীতে এসে নেয়েরা সুতা কাটত। মসলিন ছিল অনেক প্রকারের বাহারি ধরনের। একসময় ২৮ প্রকার মসলিন উৎপাদিত হতো বলে জানা যায়। আমি নিম্নে বিক্ষ্যাত কয়েকটি মসলিনের কথা উল্ল্যেখ করছি;

✅ মলবুস খাসা: রাজপরিবারে ব্যাহৃত হতো। দৈর্ঘ্যে ১০ গজ প্রস্থে ১ গজ। ওজন ৭ তোলা।

✅ মলমল খাস: আঠারশ শতকে মলমল খাস বন্ধ হয়ে যাবার পর বাদশাহদের জন্য যে নতুন মসলিন বানানো হয় সেটি।

✅ সরকার ই আলা: নবাব সুবেদার রা এটি ব্যাবহার করতেন। দৈর্ঘ্যে ১০ গজ প্রস্থে ১ গজ। ওজন ১০ তোলা।

✅ খাসা বা কুসা: খুবই মিহি আর ঘন ছিল।

✅ ঝুনা: মোঘল হারামের মহিলারা এ কাপড় পড়তেন। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলারা ও এ কাপড় ব্যাবহার করতেন।

✅ নয়ন সুখ বা তনুসুখ: গলাবদ্ধ হিসেবে ব্যানহৃত হতো।

✅ আলবালি: আতি মিহি কাপড়।

✅ শববম: এতোই মিহি যে, সকালে ঘাসের উপর শুকতে দিলে শিশিরের সাথে এর পার্থক্য করা যায় না।

✅ সরবন্ধ: পাগড়ি বাধা হতো এই মসলিন দিয়ে।

✅ ডরিয়া: ডোড়া কাটা থাকতো। অন্যমসলিন হতে একটু মোটা ছিল।এটা দিয়ে ছেলেদের পোষাক তৌরী হতো।

✅ চারকোণা চারকোণা করা থাকতো বলে এরকম নাম।

✅ বদন খাসা: পরিহিতার দেহের সভাবর্ধন করতো। বিশেষ আরাম দায়োক ছিলো। এর বুনন বেশি ঘন হতো না।

✅ জামদানি: এখনকার জামদানি না। সেকালে নকশাদার সূক্ষ্ম মসলিন কে জামদানি বলা হতো।

✅ বাংলাদেশে মসলিন তৈরির অঞ্চল সমুহ: মসলিন তৌরী হতো মূলত ঢাকা এবং এর পাশ্ববর্তী এলাকায়। মসলিন তৌরির জন্য শীতলক্ষ্যা পাড়ের আবহাওয়া ছিল সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। মসলিন প্রস্তুস করা হতো গাজীপুর এবং সোনারগাঁও অঞ্চলে।

✅ মসলিনের বিলুপ্তি: মুঘল আমলে মসলিন তৌরীর বহু পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো। মূলত পলাশীযুদ্ধের পর ই এর প্রশার কমতে থাকে। ঢালা রাজধানীর মর্যাদা হারিয়ে শহর হিসেবে এর মর্যাদা যেভাবে কমে যাচ্ছিল, তেমনি মসলিন শিল্পের ও ভাংগন ধরে। আঠারশ শতকের শেষের দিকে ঢাকাই মসলিন রপ্তানির পরিমান ১৯৪৭ এর তুলনায় অরর্ধেক নেমে আসে। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি উৎপাদন হ্রাস পেয়ে লক্ষ তুপিত্র নেমে আসে।

পশ্চাত্যের শিল্প বিপ্লব ই ছিল মসলিন ধংসের প্রধান কারন। ইংরেজ রা এদেশীয় মসলিনের উপর ৭০-৮০ শতাংশ কর আরোপ করেছিল। আর বিলাত থেকে আমদানি করা মিলের কাপড়ের উপর কর ছিল ২-১০ শতাংশ। এই বিড়াট ব্যাবধানের কারনেই বাজারে দামি মসলিনের চাহিদা কমতে শুরু করে। ইংরেজরা বহু তাত শীল্প নষ্ট করে দেয় এবং চাষীদের নীল চাষে বাধ্য করে। তাতীরা যাতে মসলিন তৌরী করতে না পরে সে জন্য তাদের আঙ্গুল কেটে নেওয়া হয়। আবার অনেকে মনে করে তাতীরা সেচ্ছায় আঙ্গুল কেটে ফেলে পরবর্তীতে যাতে মসলিন তৌরি করতে না পারে।

মূলত অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা, বাজার ধ্বংস, কাচামালের অপ্রাপ্যতা,জলবায়ু পরিবর্তন আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেই কালের গহ্বরে হারিয়ে গেলো আমাদের গৌরবের ঐতিহ্যের মসলিন কাপড়। এখন শুধু জাদুঘরেই এর দেখা মেলে।

✅ আবার ফিরবে মসলিন: আশার কথা বর্তমানে দেশেত মানুষ সহ প্রশাসন মসলিনের গুরুত্ব এবং ঐতিহ্যাসিক মান উদ্ধার করতে পেরেছে। তাই এক পুনরুদ্ধারের শ্রেষ্টা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনিস্টিটিউশন অফ বায়োলজিকাল সায়েন্স এর পরিচালক অধ্যাপক ড.মনজুর হোসেন স্যার এর নেতৃত্বে একটি দল এ নিয়ে কাজ করছে। চলছে ফুটি কার্পাস গাছের অনুসন্ধান। সেই দেয়াশলায়ের বক্সে আটবে এমন মসৃণ মসলিন তৌরি করতে পারবেন এমনটা না বললেও তাদের আশা আছে মসলিনের কাছাকাছি নিশ্চয় তৌরী করা সম্ভব।

মসলিন আমাদের ঐতিহ্য আমাদের গর্ব, আমাদের আহংকার। আমাদের জাতিসত্তার পরিচয় বহন করে এই মসলিন শিল্প। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা আর প্রচেষ্টা অব্যহত থাকলে নিশ্চয় মসলিন একদিন হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। সেদিন হয়তো মসলিন দিয়েই বাংলাদেশকে আবার নতুন করে চিনবে বিশ্ব। এমন স্বপ্ন দেখা অমূলক নয়। আমরা আশাবাদী।

✅ Writer information:

Anjelur Rahman
Primeasia University
Batch: 181
Campus Core Team Member (TES)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here