ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁত

0
515

ঐতিহ্যের কিনারা করার সাধ্য আমাদের নেই, কিন্তু আছে ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষমতা, আছে ঐতিহ্যের নব দিগন্ত উম্মচনের ক্ষমতা । হোকনা সেটি বাংগালী ঐতিহ্য আর হোক না সেটি উপজাতীয় ঐতিহ্য। আমরা যে ঐতিহ্যগত ভাবে সমৃদ্ধ একজাতি সে তো সকলেরই জানা কিন্তু চোখের আড়ালে যে কিছু মূল্যবান ঐতিহ্য রয়েছে তা হয়তো জেনে ওঠা হয়না ব্যাস্ততা নামক শব্দটির হস্তক্ষেপে।আজ নাহয় ব্যাস্ততা কে একটু আড়াল করে জানি নিজ দেশের একটি পরিচিত অজানা ঐতিহ্য কে, জানি নিজ দেশের উপজাতীয় একটি ঐতিহ্য কে, যা কিনা যুগের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে বর্তমান সময়েও।

দেশের সৌন্দর্য্য কে যদি দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায় তাহলে একটি ভাগ দখল করে নিবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল আর অন্য ভাগটি সমস্ত বাংলাদেশ মিলে ভাগাভাগি করে নেবে।চোখ ধাধানো সৌন্দর্যে ভরপুর এই অঞ্চলে রয়ছে উচু নিচু কতই না শৃংগ,ঝর্ণা ধারায় মুখোরিত হচ্ছে পাহাড়ী বনভূমি, হু হু করে ধেয়ে আসছে সাগরিকার আতংকবাজ হাওয়ার শনশনানী শব্দ অন্য দিকে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য। কি নেই এই অঞ্চলে! মন জুড়ানোর উপকরণে সজ্জিত এ অঞ্চলে রয়েছে আরো একটি সৌন্দর্য্য। যা কিনা মানব সৌন্দর্য্য। কথা শুনে কি অবাক হচ্ছেন? না না অবাক হবার কোন কারণ নেই।বলছিলাম এ অঞ্চলে বসবাসরত ১১ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কথা। যারা কিনা এনে দিয়েছেন সৌন্দর্যের ক্যানভাসে রংতুলির শেষ ছোয়াটুকু। তাদের যেমন রয়েছে স্ব স্ব ভাষা,রয়েছে স্ব স্ব ধর্ম, রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন জীবন ব্যাবস্থা, সেই সাথে রয়েছে তাদের সাধারণ কিছু ঐতিহ্য। তেমন ই একটি ঐতিহ্য কে নিয়েই আজকের আলোচনা। জানবো ঐতিহ্যবাহী “কোমর তাঁত” সম্পর্কে।

কোমর তাঁত হচ্ছে এমন একটি পোশাক তৈরির পদ্ধতি,যে পদ্ধতিতে পাহাড়ি নারীরা নিজ হাতে সামান্য কিছু সাধারণ যন্ত্রাংশের সাহায্যে নিজেদের পরীধেয় বস্ত্র তৈরী করে থাকে। পার্বত্য অঞ্চলের সবচেয়ে প্রধান ও প্রাচীনতম শহর হচ্ছে রাংগামাটি। প্রাচীনকাল থেকেই জাতিসত্তাগুলো বসবাস করে আসছে এই অঞ্চলে এবং এই সময়ে তিন পার্বত্য জেলায়। এ অঞ্চলে বসবাসরত উপজাতী রা হচ্ছে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গা, ত্রিপুরা, মুরং, পাঙ্খো, কুকী, বনযোগী, বম, লুসাই, চাক।তন্মধ্যে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এই তিনটি জনগোষ্ঠী ই সাংখ্যিক ভাবে এগিয়ে। পাহাড়ি এ উপজাতীরা প্রাচীনকাল থেকেই আত্মনির্ভরশীল ভাবে জিবীকা নির্বাহ করে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা নিজেরাই নিজেদের পোশাক তৈরী করতো এবং এখনও তা করে আসছে।প্রাচীনকালে পুরুষরা পরিধান করতো ধুতি, গামছা ও শার্ট এবং মেয়েরা পরত পিনোন বা থামি,বাদি এবং ব্লাউজ। ঘরের কাজ ও কৃষিকাজের পাশাপাশি মহিলারাই নিজস্ব কোমর তাঁতে তৈরী করতো তাদের প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন বস্ত্রাদী। সময়ের পরিক্রমায় পুরুষরা প্যান্ট, শার্ট, লুঙ্গি পরলেও নারীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক টিকেই প্রাধন্য দিয়ে থাকে পরিধানের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে এসব ঐতিহ্যবাহী জাতীয় পোশাক ব্যবহার করা হয়।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে কোমর তাঁত ব্যবহার হারিয়ে যাচ্ছে বললেই চলে। শুধুমাত্র চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে এই ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁতের প্রচলন দেখা যায়। তঞ্চঙ্গ্যা মহিলাদের পোশাক তৈরির একটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা পোশাকে সাধারণত কোন নকশা করে থাকেনা।অন্যদিকে যদি চাকমা নারীদের কথা বলা যায় তাহলে দেখা যাবে চাকমা মহিলারা তাদের নিম্নাংশ পরিধেয় পিনোনে এবং বক্ষ বন্ধনীর জন্য ব্যবহার্য খাদিতে বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় নকশা তুলে এগুলো বানায়। এজন্য উপজাতীয় সমাজে চাকমা মহিলাদের পিনোন ও খাদির কদর অধিক রয়েছে। তাদের এ কদর দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও মহিলাদের এই পিনোন, খাদি রয়েছে পছন্দের তালিকায়।পরিধেয় পিনোনের এক মাথায় যে নকশা তুলে বুনা হয় এই নকশাটাকে চাকমা ভাষায় বলা হয়ে থাকে চাবোঘী। চাবোঘীর আবার কিছু প্রকারভেদ রয়েছে। তন্মধ্যে সামোলেজ নামক চাবোঘীই সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। পিনোন বুনোনের ক্ষেত্রে নানা রকম সূতা ব্যবহার করা হয়। কি ধরনের নকশা তৈরী করা হবে তার উপরেই মূলত সূতোর রঙ নির্ভর করে। খাদিও রঙ-বেরঙের বর্ণিল সুতায় ফুল জাতীয় বিভিন্ন নকশা তুলে বোনা হয়। শুধু পিনোন, খাদি নয়- গায়ের চাদর, টেবিল ক্লথ, কাঁধের ঝোলা, মাফলার ইত্যাদিতেও রঙ-বেরঙের নকশা করে চাকমা মেয়েরা।আর এ সকল ধরনের বুনন ই করা হয় কোমর তাঁতের মাধ্যমে। পুরাকালে এসব বস্ত্রাদি তৈরির জন্য বাজার থেকে কোন সুতা কিনতে হত না এই উপজাতী দের। উপজাতিরা সাধারণত নিজেরাই সূতো উৎপাদন করে থাকে।তারা জুম চাষের সময় ধানের সঙ্গে তুলার বীজ বপন করলে প্রচুর তুলা উৎপন্ন হত। জুম চাষের সময় চাষকৃত তুলা সংগ্রহ করে পাহাড়িরা চরকা দ্বারা তুলা থেকে উৎপাদন করত সুতা। উৎপাদিত এই সুতাগুলো বনজ গাছের রসসহ নানা ধলনের প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে রঙ করা সুতা দিয়ে পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মহিলারা কোমর তাঁতে বুনে উপজাতীয় বস্ত্র তৈরি করে।

কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে উপজাতীয় মহিলাদের ঐতিহ্যবাহী এ কোমর তাঁত বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে গুটি পায়ে। বিলুপ্তির মূল কারণগুলোর মধ্যে পড়ে আধুনিকতার ছোয়া লেগেছে শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তাই সময়ের সাথে পোশাকের চাহিদা মেটাতে সকলকে হতে হচ্ছে আধুনিক যন্ত্রাংশের সম্মুখীন। সেই সাথে পড়া-লেখার সুযোগ বৃদ্ধির কারণে মেয়েরা বর্তমানে কোমর তাঁত বুননের মতো সময় সাপেক্ষ ব্যাপারে দিকে ধাবিত হচ্ছে না।এছাড়াও কিছু কারন রয়েছে যেমন দরিদ্রতার কারণ সেই সাথে তুলা, সূতা, রঙসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সমূহর উচ্চমূল্য নিরুৎসাহিত করছে কোমর তাঁত বুননে। সময়ের সাথে সাথে উন্নত হবে এ ধরনী এটিই তো নিয়ম।উন্নত হবে সকল ব্যাবস্থাপনা।কিন্তু তাই বলে কি হারিয়ে যাবে ঐতিহ্য? না হারিয়ে যাবে না।এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের উতসাহ মূলক আচরন সেই সাথে পোশাক ব্যবসায়ীদের ছাড় দেয়ার মানসিকতা সংগে ঐতিহ্য কে ধরে রাখার পর্যাপ্ত সুযোগ করে দিয়ে ককর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

লেখকঃ
মুনতাসীর রহমান
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং
বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here