Home Technical Textile টেক্সটাইল শিল্পকলায় উদ্ভিদ

টেক্সটাইল শিল্পকলায় উদ্ভিদ

ধন ধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা
কত সুন্দর বিচিত্রময় এই প্রকৃতি। ঘাস লতা পাতা ফুল সাজিয়ে দিয়েছে আমাদের এই প্রকৃতি। শুধু প্রকৃতি নয় সাজিয়ে দিয়েছে এই প্রকৃতির মানুষগুলোকেও।উদ্ভিদসমূহের কার্যকারীতা মানুষের দেহে বাড়াচ্ছে অপরুপ সৌন্দর্য আর রকমারি বাহার।অনেক উদ্ভিদের ফাইবার থেকে তৈরি হচ্ছে নানা রকম পোশাক। এসব পোশাক দেশ থেকে বিদেশে ও রপ্তানি করা হয়।

ইতিহাসঃ
বর্তমানে পোশাক তৈরিতে কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহার সর্বাধিক। ১৮৮৫ সালে কৃত্রিম তন্তু আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত শুধু উদ্ভিদ ও প্রানিজ তন্তু কাপড় ও বস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হত।সাধারণত প্রাকৃতিক তন্তু হিসাবে উদ্ভিদের বাকল,কান্ড,পাতা, ফল,বীজতন্তু এবং উদ্ভিদরস ব্যবহার করা হত।৭০০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ থেকে মানব সমাজে প্রাকৃতিক তন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বলে বিবেচিত হয়ে আসত।প্রাকৃতিক তন্তু পূর্বের ৪০০০ থেকে ৫০০০ বছর ধরে কাপড় তৈরিতে ব্যবহৃত হত।ধারণা করা হয় ৪০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ থেকে কার্পাসের জন্মভূমি ভারতে সর্ব প্রথম শোভাবর্ধক পোশাকে এর ব্যবহার করা হয়েছিল। এরকম কিছু উদ্ভিদ হলো শন, কার্পাস,পাট,বাঁশ ইত্যাদি।

শনঃ
শন থেকে তৈরি পোশাকের কথা হয়তো আমাদের অনেকেরই জানা। শনকে স্থানীয় ভাষায় খড় বলা হয়।শনকে টেক্সটাইল তৈরির তন্তুগুলোর মাঝে সবচেয়ে প্রাচীন বলে গন্য করা হয়। ৬৫০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে মমির সমাধিসৌধে এর উপস্থিতি লক্ষ করা গিয়েছে। শন গাছের কান্ডের আঁশ থেকে সংগ্রহ করা হত শনতন্তু।এর থেকে সুতা কাটা হতো তারপর একে লিলেনের বড় টুকরায় পরিনত করা হত কাপড় ও পর্দা তৈরিতে। ৩০৫ থেকে ৩৩০ খ্রীস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে মমি তৈরিতে লিলেন ব্যবহৃত হত।শন থেকে বিশেষত লেলিন কাপড় তৈরি করা হত।মমিতে ব্যবহৃত কিছু লিলেন কাপড়ে হায়ারোগ্লিফিক হরফও চিত্রায়ন করা হত।

কার্পাসঃ
টেক্সটাইল শিল্পে কার্পাস একটি অন্যতম নাম।৫০০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম কার্পাস ব্যবহৃত হয়।৩২৭ খ্রীস্টপূর্বাব্দে ইউরোপীয়রা ভারত আক্রমণ করার পর তা ইউরোপে ছড়িয়ে যায়।অষ্টাদশ শতাব্দীতে কার্পাস উৎপাদন ও তা থেকে নির্মিত বস্তুর পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এর আরামদায়কতা স্থায়ীত্ব এবং শোষণক্ষমতার দরুন এটি অন্যতম টেক্সটাইল তন্তুতে পরিনত হয়।কার্পাস তন্তু হলো কার্পাস গাছের বীজতন্তু যা গাছের ফুল জন্মানোর পর সেখানে ক্যাপসুল আকৃতির জিনিস তৈরি হবার পর পাওয়া যায়। কার্পাস তুলা থেকে মখমল,মিহি কাপড়,মোটা কাপড়, জার্সি, ফ্লানেল এবং ভেলোর তৈরি করা হয়। প্রতিটি বীজ থেকে প্রায় ৩০ টি বীজ পাওয়া যায়। প্রত্যেকটিতে ২০০ থেকে ৭০০০ টি বীজতন্তু থাকে এবং লম্বায় ২২ থেকে ৫০ মিলিমিটার হয়।এর ৯০% সেলুলোজ থাকে। এটি প্রক্রিয়াজাত করার পর বিভিন্ন পুরত্বের সুতা তৈরি করা হয়।

কলা গাছঃ
কলা গাছ একটি অতি পরিচিত প্রাকৃতিক তন্তু।কলা গাছ থেকে কাপড়ের সুতা তৈরি করা হয়। এর ফাইবার জিন্স থেকেও টেকসই। কলা গাছের ফাইবার নতুন আবিষ্কৃত নয়।ধারণা করা হয় জাপানের সম্রাট Emperor Tsuchimikada(1198-1210) শাসন আমলে গ্রামের গরীব লোকেরা কিমানো বা কামিশিমো(জাপানের ঐতিহ্যবাহী পোশাক) বানানোর জন্য কলা গাছের ফাইবার Banana Trees Fiber Facrics তৈরি করে।তবে ১৩ শতকের শুরু থেকেই পরিপূর্ণ ভাবে পরিধেয় কাপড় এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য তৈরিতে জাপানের মানুষ কলার আশ ব্যবহার করে আসছে। এই ফাইবার তুলনামূলক ভাবে অন্যান্য ফাইবার থেকে অনেক শক্ত এবং টেকসই। এটি দেখতে উজ্জল সিল্কের মতোই এবং ওজনেও হালকা। অল্পখরচে অনেক লাভ। কোয়ালিটি ভেদে একটি গাছ থেকে ৭ kg থেকে ১৮ kg পর্যন্ত ফাইবার পাওয়া যেতে পারে।

পাটঃগ্রামীণ জীবনের দিকে তাকালে আমরা সবচেয়ে বেশি যে ফাইবার যুক্ত উদ্ভিদ দেখতে পাই তা হলো পাট।পাটের সোনালি আশ থেকে তৈরি করা হয় সুতা। শীতের পোশাক তৈরিতে পাট বহুল ব্যবহৃত তন্তু।পাট তন্তু থেকে তৈরি করা হয় নানা পোশাক প্যান্ট,জ্যাকেট,শার্ট ইত্যাদি। এসব পোশাক রপ্তানিও করা হয়।বাংলাদেশে রয়েছে অনেক পাটকল। বর্তমানে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন পাট থেকে ডেনিম কাপড় উৎপাদন করছে।এই তন্তু পরিবেশবান্ধব এবং উৎপাদিত পন্য বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়।


বাঁশঃটেক্সটাইল জগতের নবীনতর সংযোজন হলো বাঁশ ফাইবার। পরিবেশ বান্ধব বস্ত্র শিল্পের বিপ্লব শুরুর মুখ্য ভূমিকায় ছিল বাঁশ।সব ফাইবার ই টেক্সটাইল ফাইবার নয়।বাঁশ তেমনই একটি ফাইবার যাকে টেক্সটাইল ফাইবার বলা চলে না কিন্তু একে কৃত্রিমভাবে টেক্সটাইল ফাইবারের গুণাবলী দান করা হয়। এজন্য একে ৩০% তুলার সাথে মিশিয়ে ব্লেন্ড করা হয়। এর উৎপাদন প্রক্রিয়া দ্রুত ও খরচ কম।বাঁশের চাষে কোনো কীটনাশকের প্রয়োজন নেই তাই এই ফেব্রিকস নিরাপদ। এই ফেব্রিকস অনেকটা সিল্কের মতো। বাঁশ দিয়ে পোশাক তোয়ালে থেকে ডায়াপার ও তৈরি হচ্ছে। এর বহুবিধ উপকার রয়েছে যেমন,দৃঢ়তা, নমনীয়তা ও মসৃণতা। তুলার বিকল্প হিসাবে বাঁশ ব্যবহার করা যাবে। এটি uv   প্রতিরোধী,ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী ও তাৎক্ষনিক আদ্রতা শোষণ করতে পারে।


তিসিঃএটি একটি আশ জাতীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Linum usitatissimum তিসি গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এটি একই সাথে তেল ও আশ উৎপাদনকারী।মিশরে সর্ব প্রথম বস্ত্র তৈরিতে তিসির ব্যবহার করা হয়। সাধারণত এই ফাইবার দ্বারা লিলেন জাতীয় বস্ত্র তৈরি করা হয়।
বর্তমানে ইলেক্ট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে যেকোনো সুতা কোন উদ্ভিজ্জ তন্তু থেকে তৈরি তা বের করা যায়। উদাহরণস্বরুপ শনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানিরা উলম্ব সুতা খোঁজেন যা অণুবীক্ষণ যন্ত্রে রাখার পর যদি দেখা যায় এটি শন গাছের কান্ডের কোষ তবে এটিকে তারা শনতন্তু বলে অবিহিত করেন।কার্পাসের ক্ষেত্রে সুতাগুলো বুনন করার জন্য শুকানোর সময়ে যদি মোচড়ের সৃষ্টি হয় তবে তাকে কার্পাস তন্তু বলে অবিহিত করেন।বর্তমান যুগে টেক্সটাইল শিল্পে উদ্ভিদের নতুন নতুন ব্যবহার আবিষ্কৃত হচ্ছে। যেমন, সুজানে লির বায়োকালচার শিরোনামের নতুন ধরনের শিল্পকলার আবিস্কার। তিনি গজনের সাহায্যে উদ্ভিজ্জ কাঁচামাল  দিয়ে কাগজ শিট তৈরি করেছেন যা কাপড় তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে।
বিভিন্ন উদ্ভিদের ফাইবার থেকেই তৈরি হচ্ছে নানা রকম পোশাক। এ সকল উদ্ভিদের উৎপাদন বাড়লে পোশাক শিল্প আরো উন্নত হবে। আঁশ জাতীয় উদ্ভিদের উৎপাদন বাড়লে কাচামালের সঠিক যোগান দেয়া যাবে।যেহেতু বাংলাদেশ রপ্তানিখাতে পোশাক অন্যতম তাই এসকল উদ্ভিদের উৎপাদন বাড়াতে আমাদের সচেতন হতে হবে।আমাদের দেশের ভালো textile investor এবং ভালো গবেষক ও  textile engineer রা এগিয়ে আসলে আরো ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব।


তথ্যসুত্রঃউইকিপিডিয়া, যুগান্তর, প্রথম আলো

নামঃ মোছাঃ আফছানা আক্তার উর্মি

Dr. M A Wazed Miah Textile Engineering College,Pirganj, Rangpur

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author