ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড জুট টেকনোলজি

0
1113

✅ পার্ট-০২

✅ প্রথমে আমরা জেনে রাখি ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং আসলে কি? সকল প্রকৌশল বা ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে সকল মানুষের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করে জীবন সহজ করে। আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ ছোটবেলা থেকে ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্ন দেখে। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার আগে অবশ্যই জেনে বুঝে পড়তে যাওয়া উচিৎ। সঠিকভাবে ধারণা না থাকলে পরে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তুলনামূলক অনেক কম সময়ে অর্থাৎ ৪ বছরে পড়ালেখা শেষ করে মোটামুটি ছোট একটা চাকুরী পাওয়া সম্ভব। ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং আমাদের দেশে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা বেশি পড়ে। এখন আসি কারা ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বেন? একদম সহজ ও এক কথায় উত্তর হলো যাদের আর্থিক সমস্যা আছে অথবা ইন্টারমিডিয়েটে ভালো রেজাল্ট করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার মতো দম নেই অথচ ইঞ্জিনিয়ার হবার প্রবল ইচ্ছা আছে তাদের। আর যাদের এই দম আছে যে আমি পারবো ইন্টারমিডিয়েটে ভালো রেজাল্ট করতে এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতে তাদের জন্য অবশ্যই ডিপ্লোমা করা উচিৎ না। ডিপ্লোমা করলেও যদি আপনি ভালো ফলাফল করে ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি করতে পারেন সেক্ষেত্রে ভিন্ন হিসাব। আমার ডিপ্লোমা নিয়ে গতবারের লেখাটিতে বলে দেওয়া হয়েছে কোথায় ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ আছে এবং ডিপ্লোমা শেষে কোথায় বিএসসি করার সুযোগ আছে। লেখাটি আমাদের ওয়েবসাইটেই Diploma in Textile Engineering লিখে সার্চ করলে পেয়ে যাবেন।

✅ একটা সাধারণ প্রশ্ন যে কেউই যখন তখন করতে পারে সেটি হলো অনেক বিষয় থাকতে কেন? কিসের প্রয়োজনে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট খোলা হল? এটার উত্তর অবশ্যই হওয়া উচিত বাংলাদেশে এই সাবজেক্টটি আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এটাকে যুগান্তকারী ঘটনা বললে সাধারণ মানুষ হয়তো ভুল বলে গালিগালাজ করবে না। কারণ বাইরের দেশের সাথে যেই খাত দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা করতে পেরেছে এবং বিদেশের মাটিতে যে খাতকে গর্বের সাথে উপস্থাপন করে নিজের দেশকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে সেই খাতকে আরও উন্নত ও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চালাতেই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টের উপর সরকার গুরুত্ব আরোপ করেছে।

এখন যদি আমরা বর্তমান বাংলাদেশে চাকরির ক্ষেত্রে বিবেচনা করি তাহলে এই সেক্টরটি অন্য সেক্টর থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের যতগুলো টেক্সটাইল কারখানা রয়েছে তার বেশির ভাগেরই অবস্থান ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর। এছাড়াও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কারখানা রয়েছে। আমরা সকলেই হয়তো জানি সমগ্র বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় অর্থাৎ চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের টেক্সটাইল সেক্টরের পরবর্তী চীন হিসেবে আখ্যা দেয়।

✅ তৈরি পোশাক খাতে হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আমরা আগে বাণিজ্যিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও কানাডায় পণ্য রপ্তানি করতাম কিন্তু এখন আমরা পূর্ববর্তী রাষ্ট্রসহ চীন রাশিয়া জাপান অস্ট্রেলিয়া তুরস্ক এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও পোশাক পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছি।এছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি করা হয়ে থাকে।

✅ বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠনের (বিজিএমইএ) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত সাড়ে পাঁচ বছরে ১২৫০ কারখানা বন্ধ হয়েছে কিন্তু চালু হয়েছে নতুন ৩০০ থেকে ৩৫০ টি কারখানা।এর মধ্যে ৮০ টি পরিবেশবান্ধব কারখানা বর্তমান বাংলাদেশের পোশাক কারখানার সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৪০০ টি।

✅ এবার আসি এই সেক্টরের চাকরির ক্ষেত্রে পোশাক কারখানার ছাড়াও এই খাতে আরো নানা সুযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছেঃ

১. বস্ত্র পরিদপ্তর।
২. বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট।
৩. বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন।
৪.বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশন।
৫.জুট ডাইভারসিফিকেশন এন্ড প্রমোশন সেন্টার।
৫.অভ্যান্তরীন সম্পদ বিভাগ( অর্থ মন্ত্রণালয়)
৬.বাংলাদেশের সকল ব্যাংক (Assistant engineer Textile)
৭.বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস।
৮. বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন।
৯. তুলা উন্নয়ন বোর্ড।
১০ বাংলাদেশে রেলস উন্নয়ন বোর্ড।
১১.বাংলাদেশের সরকারি টেক্সটাইল কলেজ ও ইন্সটিটিউট সমূহ।

✅ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের ধরনের বৈচিত্র্য আরো বেশি।

১. অটোমোবাইল কোম্পানি।
২. অ্যারোনেটিকাল মেডিকেল টেক্সটাইল কোম্পানি।
৩. বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি।
৪. বিভিন্ন দেশের কান্ট্রি ম্যানেজার হওয়া সহ আরো যে সকল সুযোগ রয়েছে তা হলো – ফ্যাশন ডিজাইনার, মার্চেন্ডাইজার, কাটিং, প্রিন্টিং, ডায়িং, নিটিং, উইভিং, স্পিনিং, ল্যাব টেস্টিং, ওয়াশিং এছাড়াও বায়িং হাউসগুলো প্রোডাকশন লিডার, কোয়ালিটির লিডার, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে রয়েছে কাজের সুযোগ।

✅ উচ্চশিক্ষাঃ ডিপ্লোমা করে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার যতটা সুযোগ আছে, তার চাইতে বিএসসি করে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার সুযোগ অনেক গুনে বেশি। বাংলাদেশ পাবলিক প্রতিষ্ঠানে এমএসসি ও উচ্চ গবেষণার সুযোগ রয়েছে কেবল বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ ব্যতীত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করার সুযোগ নেই। তবে উল্লেখিত বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনকারীর সংখ্যার বিপরীতে সিট সংখ্যা খুবই নগণ্য। এছাড়া হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স (এমএসসি) করার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী বিএসসি অনার্স শেষ করে স্কলারশিপ নিয়ে কানাডা, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, জার্মানির মতো দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমায়। দেশের বাইরে এমএসসি, পিএইচডি ডিগ্রী নেওয়ার জন্য কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ঃ

1.University of Manchester(UK)
2.University of Bolton (UK)
3.North Carolina State University (USA)
4.Kaunas University of Technology (USA)
5.Wuhan Textile University ( China)
6.Dresden University (Germany)
7.Deakin University (Australia)
8.Boros University (Sweden)
9.Politecnico di Torino (Italy)
10.IIT, India

এছাড়া দেশের বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা যায়।

✅ আসলে এটি আমাদের ভ্রান্ত ধারণা যে ডিপ্লোমা করলেই চাকরী পাওয়া যায়। বাস্তবতা কিন্তু এমনটা আমাদের বলে না। প্রায় ৪০ ভাগেরও বেশি ডিপ্লোমাধারীরা কিন্তু এখোনো বেকার। কারণ একটাই তাদের ব্যবহারিক জ্ঞান নেই। তাই আপানাদের নিকট আগাম সতর্কবার্তা যে আপনারা আগে থেকেই সাবধান হয়ে যান, আর নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে সচেতন হউন। আরেকটা কথা মনে রাখা উচিৎ ডিপ্লোমা পাশ করে নিজের হাতে কাজ করতে হয়, বিপরীতে বিএসসি করলে আপনাকে নিজের হাতে কাজ অনেকটাই করতে হয়না। শুধু নিজ দায়িত্বে অন্যের কাছ থেকে কাজ বুঝে নিতে হয়। যদি জীবনে অল্প লেখাপড়া করে নিজেকে কর্মের মধ্যে রাখতে চান তবে ডিপ্লোমা পড়ুন। আর যদি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চান তবে ইন্টারমিডিয়েটে ভালো রেজাল্ট করে বুটেক্স, বুয়েট, রুয়েট, চুয়েট ইত্যাদিতে ভর্তি হন।

✅ যারা ডিপ্লোমা পড়তেছেন বা পড়ার ইচ্ছা আছে তাদের জন্য কিছু টিপ্সঃ

১. ব্যবহারিক ক্লাস কখনো মিস করবেন না।
২. ব্যবহারিক বিষয়গুলো না বুঝলে এড়িয়ে যাবেন না, প্রয়োজনে শিক্ষকের সহায়তা নিন।
৩. আপনার ইন্সটিটিউটে আপনার বিভাগের অধীনে ৩-৬ মাস পরপর কয়েকটা বেসিক ট্রেড কোর্স হয় সেগুলো অনেক অল্প টাকায় করানো হয়। এই কোর্সগুলো করবেন।
৪. আপনি সিনিয়র ইন্সট্রাক্টরদের সহায়তায় আপনার বিষয়ভিত্তিক কাজ কোথায় শিখবেন জেনে নিন।
৫. আপনার বিভাগের মেধাবী বড়ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন, তারা কি করছে তা জানুন এতে আপনার অভিজ্ঞতা বাড়বে।
৬. শিক্ষানবিশ পার্ট-টাইম জব নিন আপনার বিষয়ে।

✅ সার্টিফিকেট এ ভালো পয়েন্ট পাবার ব্যবস্থাঃ

১. শিক্ষকদের সাথে ভালো ব্যবহার করুন, কারণ তাদের হাতেই অনেক প্র্যাক্টিক্যাল মার্কস থাকে।
২. স্যারদের সামনে নিজেকে ফোকাস করুন, স্যাররা আপনাকে আরো বেশি স্মরণ রাখবে।
৩. বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় পারুন আর না পারুন অংশগ্রহন করুন, এতে আপনি সবার নজরে আসবেন।

সবশেষে একটি কথা- সফল ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে থাকুন। আপনার কাছে যারা সফল তাদের সান্নিধ্যে থাকুন। সফল ব্যক্তিদের অনুসরণ করুন। পৃথিবীতে যারা সুপরিচিত এবং সফল তাঁদের অনুসরণ করুন, তাঁদের লেখা পড়ুন এবং বক্তব্য শুনুন। ব্যর্থ ব্যক্তিদের থেকে দশহাত দূরে থাকুন কারণ ব্যর্থ ব্যক্তির মুখ থেকে আট দশটা হতাশার বাণী শোনার চেয়ে সফল ব্যক্তির একটি কথা শোনাও অধিক উপকারী।

Writer:

Sajjadul Islam Rakib
Dept. of Textile Engineering
National Institute of Textile Engineering and Research-NITER (10th Batch)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here