পোষাক শিল্পের সাথে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা

0
655

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ তৈরি পোশাক খাত থেকে অর্জিত হয়। আর আমাদের এই পোশাক শিল্প টিকিয়ে রাখতে অনেক গুলো প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় ক্রেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর পরই ইউরোপ ও কানাডা। বিশ্বের ৩০টি দেশে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি বেলজিয়াম ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া প্রভৃতি দেশে বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের বেশ কদর রয়েছে। ফলে এর বাজার যেমন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও পোশাক শিল্পের কল্যাণে বিভিন্ন সহায়ক সেবা খাত যেমনঃ ব্যাংক, বীমা,পরিবহন,আইটি পর্যটন এরকম অনেক খাত গড়ে উঠেছে। যেগুলো আমাদের পোশাক শিল্পকে উন্নয়নের অগ্রগতিতে পৌঁছানোর জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। ১৯৭১ সালের  স্বাধীনতা অর্জনের পর সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশ ছিলো দরিদ্রদেশগুলোর অন্যতম। আর এই দরিদ্র দেশকে উন্নতির শিখরে এনেছে বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠান। যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মজবুত দ্রুত শিল্পায়নে পোশাকশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। এর ফলে দেশে স্পিনিং, উইভিং, নিটিং, ডাইং, ফিনিশিং, প্রিন্টিং ইত্যাদি শিল্প গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া ও জিপার, বোতাম ইত্যাদি শিল্পেরও প্রসার ঘটছে। এই পোশাক শিল্প বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে বৈদিশিক আয়ের উৎস এবং মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে যাওয়া এই শিল্প ধীরে ধীরে আমাদের গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে। পোশাকশিল্পে বাংলাদেশ বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। এ দেশের তৈরি পোশাকশিল্প রপ্তানি বাণিজ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বেকার সমস্যা সমাধান, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ শিল্পের অবদান উৎসাহজনক।  আর এই পোশাক শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে অনেক গুলো শিল্প প্রতিষ্ঠান যেমনঃ BKMEA, BGMEA, BTMA, BTMC, BFPZA, BJMC ইত্যাদি। নিচে কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কে  তুলে ধরা হলোঃ

BKMEA:

BKMEA  এর পূর্ণরুপ হলো Bangladesh Knitwear Manufactures and Association. BKMEA হলো একটি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান। যা বাংলাদেশের বৈদিশিক আয়ের একটি বড় উৎস। এই প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরিকৃত  পোষাক বিশ্বের বিভিন্নদেশে রপ্তানি হয়। ফলে বাংলাদেশ অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।বাংলাদেশের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানে নারীদের গুরুত্ব অনেক রয়েছে। কারন নারীদের কর্মসংস্থানের জোগান দেয় অনেকগুলো শিল্প প্রতিষ্ঠান। এইসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করে নারীরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। তাই বলা যায় পোশাক শিল্প গুলোর মধ্যে  ‘BKMEA’ প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে।যা বাংলাদেশের কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের জোগাড় করে দিয়েছে।

BGMEA:

BGMEA এর পূর্ণরুপ হলো Bangladesh Garment  Manufactures And Exporters Association. এটিও বাংলাদেশের বড় একটি  শিল্প প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৭ সালে এটি প্রতিষ্টা লাভ করে। এটি হলো বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিমূলক সমিতি। বাংলাদেশের হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্তানের জায়গা এটা। অনেক বৈদেশিক আয়ের ও একটি বড় উৎস,  যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা পালন করেছে।এছাড়াও বিজিএমইএ  এর অধীনে ৩০০-৪০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যা বাংলাদেশের অীথনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। তাই বলা যায় যে পোশাক শিল্প গুলোর মধ্যে  বিজিএমইএ  এর গুরুত্ব অপরিসীম।আর বাংলাদেশের ৮০% বৈদিশিক মুদ্রা আসে পোশাক শিল্প থেকে।এই শিল্প প্রতিষ্ঠান গুলো অনেক ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।

BTMC:

BTMC এর পূর্ণরুপ হলো Bangladesh Textile Mills Corporation. ১৯৭২ সালের ২৬ শে মার্চ  বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজেম ( রাষ্ট্রীয়করন) অর্ডার  ২৭, ১৯৭২ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশন BTMC  প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালের ১ লা জুলাই হতে ৭৪ টি  মিল নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়।পরবর্তীতে  BTMC  ও সরকারের উদ্যেগে ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে আরও ১২ টি মিল প্রতিষ্ঠা করা হয়। পলে বিটিএমসি এর সর্বমোট মিলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৬ টি। সরকারের বি-রাষ্ট্রীয়করন শিল্পনীতির আওতায় ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ৬৫ টি হস্তান্তর,বিক্রি করা হয়।পরবর্তীতে ২০১৭-২০১৮ সাল পর্যন্ত হস্তান্তরিত ও ৭ টি মিল সরকার কর্তৃক পুনঃগ্রহন করে বিটিএমসি এর নিকট ন্যস্ত করা হয়। ফলে বিটিএমসি এর নিয়ন্ত্রণে চালু ও বন্ধ মিলে মোট ২৫ টি মিল রয়েছে।আর এভাবেই বিটিএমসি বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।এছাড়াও বিটিএমসি দেশে-বিদেশে যৌথ বিনিয়োগ   পি পি পি এর মাধ্যমে মিলসমূহ পরিচালনার লক্ষ্যে প্রকল্প চিহ্নিতকরনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।উন্নয়নশীল কর্মমপরিকল্পনা প্রণয়ন উৎপাদনের গুনগতমাত নিশ্চিত। সরকারী সম্পদের যথাযথ ও যুগোপযোগী  ব্যবহার নিশ্চিতপূর্বক আর্থিক স্বচ্ছলতা আনয়নের সাথে সাথে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। তাই বলা হয় পোশাক শিল্পে বিটিএমসি এর সম্পৃক্ততা অপরিসীম।

BEPZA:

BEPZA এর পূর্ণরুপ হলো  Bangladesh Export Processing Zones Autherity. এটি একটি বড় প্রতিষ্ঠান। এর অর্থ হলো বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিশাকরন এলাকা কর্তপক্ষ। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাহিরে দেশে পোশাক রপ্তানি করা হয়।BEPZA প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের একটা উৎস।বাংলাদেশের অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের জায়গা এটা। বাহিরের দেশে পোশাক রপ্তানি করে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। BEPZA  এর ভূমিকা পোশাক শিল্পে অপরিসীম।

BJMC:

BJMC এর অর্থ হলো Bangladesh Jute Mills Corporatioan. বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন। জাতীশ পাটকলসমূহ নিয়ন্ত্রণ, পরিদর্শনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আদেশক্রমে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ জুট  কর্পোরেশন (BJMC) প্রতিষ্ঠিত হয় l চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে বোর্ড অব ডিরেক্টরস কর্তিক বিজেএমসি পরিচালিত হয়। বর্তমানে এই সংস্থার অধীনে তিনটি নন জুট প্রতিষ্ঠানসহ মোট 26 টি মিল রয়েছে। ঢাকা অঞ্চলের অধীনে সাতটি, চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধীনে দশটি এবং খুলনা অঞ্চলের অধীনে নয়টি মিল রয়েছে। আঞ্চলিক মিল স্তম্ভ 2 দেখাশোনা ও সমন্বয়ের জন্য বিজেএমসি এর দুইটি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে।প্রতিটি মিলের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিদর্শনের জন্য চেয়ারম্যান বা বিজেএমসি এর যেকোন পরিচালক এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ,অর্থ মন্ত্রণালয় ,বিজেএমসি ও ব্যাংকের প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে একটি করে পরিচালনা পরিষদ রয়েছে। পরিচালনা পরিষদের সদস্যগণ সংশ্লিষ্ট মিলের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করে থাকেন। এছাড়া সদস্যগণ মিল সুষ্ঠু ও দক্ষ ভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে  প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। যে সমস্ত অঞ্চলে পাট উৎপাদিত হয়,সে সমস্ত এলাকার 182 টি পাট ক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে BJMC এর পাট ক্রয় করে। বৃহত্তম পাট পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিজেএমসি প্রধানত হেসিয়ান কাপড়, ব্যাগ ,বস্তার কাপড়, সুতা, কম্বল ,মোটা কাপড় ,সিবিসি ইত্যাদি প্রস্তুত করে থাকে। বিজেএমসি এর বিক্রয় বিভাগে সকল পণ্য দেশি ও বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা অনুসারে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে থাকে।এভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিজেএমসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বর্তমানে বিজেএমসি জনগণের দিক থেকে সর্ববৃহৎ একটি প্রতিষ্ঠান।এই সংস্থায় প্রায় 70 হাজার শ্রমিক এবং 6500 কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি নিযুক্ত রয়েছে। পরোক্ষভাবে 60 লক্ষ কৃষি পরিবার এর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে ।প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে পাঁচ কোটিরও অধিক মানুষ পাট ও পাট শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। যা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই বলা হয় পোশাক শিল্পে বিজেএমসি এর সম্পৃক্ততা অতুলনীয়।
বাংলাদেশ পোশাক শিল্পের মাধ্যমে একটি উন্নয়নশীল জাতিতে পরিণত হয়েছে। উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। যার ফলে বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ থেকে ধনী দেশ নামে পরিচিতি লাভ করছে। বাংলাদেশ হলো কৃষিপ্রধান দেশ। আর এই কৃষকদের নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বাংলাদেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিচ্ছে। তাই বলা হয় বাংলাদেশপোশাক শিল্পের সাথে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ততা অপরিসীম।

তথ্যসূত্রঃ বিজিএমইএ ওয়েবসাইট, বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন ওয়েবসাইট। 

লেখকঃ

Prottay Mazumder
Mithun Antor Saha
BGMEA UNIVERSITY OF FASHION AND TECHNOLOGY 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here