Home Life Style & Fashion মক্কার পবিত্র কাবা শরিফের স্বর্ণ মন্ডিত গিলাফ তৈরির ইতিবৃত্তঃ

মক্কার পবিত্র কাবা শরিফের স্বর্ণ মন্ডিত গিলাফ তৈরির ইতিবৃত্তঃ

পবিত্র কাবা শরিফঃ পবিত্র কাবাঘরকে আরবিতে বলা হয় ‘বায়তুল্লাহ’।যার অর্থ আল্লাহর ঘর, যা ‘মসজিদুল হারাম’ নামেও পরিচিত।ভৌগোলিভাবে গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে বরকতময় পবিত্র কাবার অবস্থান।কাবাঘরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো,তা পৃথিবীর সর্বপ্রথমও সুপ্রাচীন ঘর। মহান আল্লাহ তা’আলা সূরা আলে-ইমরানের ৯৬নম্বর আয়াতে বলেন,” নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, সেটিই হচ্ছে এ ঘর,যা মক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্য হেদায়েত ও বরকতময়।”

অনেক ধর্মেই উপাসনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিক থাকে।সেরকমই মুসলমানদের নামাজের জন্য মুখ করে দাঁড়ানোর দিকটি হচ্ছে মক্কায় অবস্থিত কাবা শরিফ বা মসজিদুল হারাম। তবে,প্রথমে কাবাশরিফ কিবলা ছিলো না। বরং প্রথম কিবলা ছিলো জেরুজালেমে অবস্থিত’ মসজিদুল আকসা’। মদীনায় হিজরতের ষোল মাস পর কুরআনের নিদর্শনা অনুযায়ী কিবলা পরিবর্তন হয়ে বর্তমানের কিবলা অর্থাৎ কাবা শরিফ কিবলা হিসেবে নির্ধারিত হয়।

কাবা শরিফের আবরণঃ কাবা শরিফ কালো সিল্কের উপরে স্বর্ণ-খচিত ক্যালিগ্রাফি করা কাপড়ের গিলাফে আবৃত থাকে।কাপড়টি ‘কিসওয়া’ নামে পরিচিত।

কিসওয়া কিঃ আরবি ভাষায় ‘কিসওয়া’ অর্থ আচ্ছাদনকৃত কাপড়। কিন্তু, এটি হলো সিল্কের তৈরি,যা কাবা শরিফকে ঢেকে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়।এটি তামার রিং ও পাথরের সাহায্যে বেধে রাখা হয়। বর্তমানে গিলাফ কালো রেশমি কাপড় দ্বারা নির্মিত,যার ওপর স্বর্ণদিয়ে লেখা থাকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ “, ” আল্লাহু জাল্লে জালালুহু”, “সুবহানাল্লাহু ওয়া বেহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আযিম” এবং “ইয়া হান্নান, ইয়া মান্নান”। চারকোণায় সূরা ইখলাস স্বর্ণসূত্রে বৃত্তাকারে খোদাই করে তৈরি করা হয়। রেশমি কাপড়টির নিচে মোটা সাধারণ কাপড়ের লাইনিং থাকে।

কিসওয়া দ্বারা আচ্ছাদনের প্রবর্তকঃ কাবা শরিফের গিলাফ বা কিসওয়া দ্বারা আচ্ছাদন কখন বা কার উদ্যোগে শুরু হয় সে সম্পর্কে মতানৈক্য রয়েছে। একটি ঐতিহাসিক সূত্রানুযায়ী নবী হযরত ইসমাইল (আঃ) প্রথম পবিত্র কাবা শরিফকে গিলাফ দ্বারা আচ্ছাদন করেন।ভিন্ন আরেকটি বর্ননা আছে যে, শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ(সা.) এর পূর্ব পুরুষ আদনান ইবনে আইদ পবিত্র কাবা শরিফকে প্রথম গিলাফ দিয়ে আচ্ছাদিত করেন। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের বর্ননা অনুসারে হিমিয়ারের রাজা তুব্বা আবু কবর আসাদ ই সম্ভবত পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ আচ্ছাদনকারী প্রথম ব্যক্তি। কথিত আছে, তিনি তৃতীয় দফায় স্বপ্নাদেশের পর ইয়েমেনের লাল ডোরাকাটা কাপড় দিয়ে পবিত্র কাবাঘর আচ্ছাদিত করেন।

সুন্দর কাপড়ের গিলাফ বা কিসওয়াঃ তুব্বা আবু কবর-এর রীতি অনুযায়ী মক্কার স্থানীয় লোকজন সুন্দর কাপড় বা গিলাফ দিয়ে পবিত্র কাবাঘর আচ্ছাদন করতে থাকে এবং তা নিয়মিত প্রথায় পরিণত হয়। বর্তমানে দামী কালো রং সিল্কের কাপড়ের তৈরি স্বর্ণ-খচিত ক্যালিগ্রাফি মোটা গিলাফ দিয়ে কাবা শরীফ আচ্ছাদন করা হয়।

আব্বাসীয় খলিফা আল আব্বাস আল মাহদী ১৬০ হিজরীতে পবিত্র হজ্ব পালনকালে পবিত্র কাবা থেকে একটি ছাড়া সবগুলো সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। এখনো এই ধারাই অব্যাহত রয়েছে।

৭ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের আগে মুহম্মদ (সা:) গিলাফ পরানো শুরু করেননি। অত:পর গিলাফ পরানোর সংস্কৃতি অব্যাহত থাকে। বাদশাহ বাইবার্স হচ্ছেন পবিত্র কাবায় গিলাফ পরিয়ে দেয়া প্রথম মিশরীয় শাসক। তারপর ইয়েমেনের বাদশা আল মুদাফ্ফার ৬৫৯ হিঃ কাবা শরীফে গিলাফ পরান।

পরবর্তীতে মিসরের শাসকরা পর্যায়ক্রমে এ কাজ অব্যাহত রাখেন। বাদশাহ আবদুল আজিজ আল সউদ মক্কা-মদীনার দুই পবিত্র মসজিদের দেখাশোনার দায়িত্বভার গ্রহণের পর ১৩৪৬ হিজরিতে কাবা শরীফের গিলাফ তৈরির জন্য একটি বিশেষ কারখানা স্থাপনের নির্দেশ প্রদান করেন। একই বৎসর মাঝামাঝি সময়ে প্রয়োজনীয় কাপড় তৈরি করে মক্কার দক্ষ শিল্পীর মাধ্যমে তা সুন্দর নকশায় সুসজ্জিত করে কাবা শরীফ আচ্ছাদিত করা হয়।

গিলাফ তৈরির কারখানাঃ বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদ মক্কা মদিনার দুই মসজিদের দেখাশোনার দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৩৪৬ হিজরিতে কাবার গিলাফ তৈরির জন্য একটি কারখানা স্থাপনের নির্দেশ দেন। ওই বছরের মাঝামাঝিতেই মক্কার দক্ষ শিল্পীরা গিলাফ তৈরি করে কাবা শরিফ আচ্ছাদিত করতে সক্ষম হয়। পরে ১৩৮২ হিজরিতে আধুনিক ব্যবস্থাপনায় কাবার গিলাফ তৈরির নির্দেশ দেন তৎকালীন সৌদি বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদ। তার নির্দেশে গিলাফ বা কিসওয়া তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয় পবিত্র কাবা থেকে চার কিলোমিটার দূরে উম্মুল জুদ এলাকায়, যার নাম ‘ King Abdul Aziz Complex ‘।

গিলাফ তৈরির প্রস্তুত প্রণালীঃ গিলাফ বা কিসওয়া তৈরি করা হয় চার ধাপে। প্রথমে ইতালি থেকে আমদানিকৃত কাঁচা সিল্ক ২২ ঘন্টা কালো রঙের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয়। তারপর, ওভেন দ্বারা এগুলোকে প্লেইন কালো শিট আকারে করা হয়। এর পরের ধাপে,এই কালো শিটের কিছু অংশে হলুদ ও সাদা সুতা দিয়ে ‘লেখার অংশের ভিত্তি’ করা হয় আর বাকি অংশ কালোই রাখা হয়। এই প্রক্রিয়ার পরে তা গিলাফ হিসেবে তাপ-চাপ, আদ্রতা ও বৃষ্টি হতে প্রতিরোধক্ষম কিনা ও ঘনত্ব পরীক্ষা করা হয়। সর্বশেষ ধাপে, বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে কারুকার্যের ভিত্তি অনুযায়ী বুনন কাজ শুরু হয় সোনা- রূপা মিশ্রিত সুতা দ্বারা। আর, এই বুনন কাজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ শিল্পীদের পাশাপাশি এখন উন্নত যন্ত্রপাতিরও ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে।

গিলাফের রঙের পরিবর্তনের ধারাঃহাদিসের বর্ণনা মতে, নবম হিজরিতে রাসূল (সাঃ) মক্কা বিজয় করে হজ্জ পালনকালে আরাফার দিন (৯ জিলহজ্জ) সাদা রঙের ইয়েমেনি কাপড় দ্বারা পরিবর্তন করা হয়েছিল। অতঃপর হযরত আবু বকর(রাঃ), হযরত উমর (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) – এর সময়ে পবিত্র কাবা শরিফ সাদা কাপড় দ্বারা আবৃত করা হয়। ইবনে জুবাইর (রাঃ) এর সময় লাল ব্রোকেড কাপড় দিয়ে আবৃত করা হয়। আব্বাসি যুগে কখনও সাদা কখনও লাল কাপড় দ্বারা আবৃত করা হয়। সেলজুকি শাসনামলে কাবা ঘর হলুদ কাপড় দিয়েও আবৃত করা হয়। আব্বাসি খলিফা নাসির কাবা শরিফ কালো কাপড় দ্বারা আবৃত করে। এরপর থেকে কালক্রমে কালো কাপড় ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

গিলাফ কথনঃ কাবা শরিফের দরজা ও বাইরের গিলাফ দুটোই মজবুত রেশমি কাপড় দ্বারা তৈরি। গিলাফের মোট পাঁচটি টুকরা বানানো হয়। চারটি টুকরা চারদিকে ও পঞ্চম টুকরাটি দরজায় লাগানো হয়। টুকরোগুলো সেলাইযুক্ত। কাবা শরিফের গিলাফের প্রতিটি কাপড়ের জন্য প্রয়োজন হয় ৬৭০ কেজি রেশম,১৫০ কেজি স্বর্ণ ও রূপার চিকন তার। ৪৭ থান সিল্কের কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয় এই গিলাফ। এর মোট আয়তন ৬৫৮ বর্গ মিটার। প্রতিটি থান ১মিটার লম্বা,৯৫ সে.মি. চওড়া, যা পরস্পরের সঙ্গে মজবুত ভাবে সেলাইযুক্ত। কালো কাপড়ের নিচে অফ- হোয়াইট কালারের আলাদা একটি কাপড় যুক্ত থাকে। প্রতি বছর দুটি করে ( একটি সতর্কতামূলক) গিলাফ তৈরি করা হয়। হাতে তৈরি করতে সময় লাগে আট থেকে নয় মাস। অন্যটি মেশিনে মাত্র একমাসে তৈরি করা হয়। কাবাঘরে গিলাফ আটকানোর জন্য ব্যবহার করা হয় তামার আংটা,যা কাবার ছাদে ও কাবার দেয়ালের নিচের অংশে লাগানো আছে। কয়েকদিন পর পর কাবার গিলাফ পরিষ্কার – পরিচ্ছন্ন করা হয়, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও করেন বিশেষজ্ঞরা।

গিলাফ পরিবর্তনঃ প্রতি বছর হজ্জের আগে কাবা শরিফের গিলাফ সরিয়ে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়৷ হাজিদের ইহরামের শ্বেত শুভ্রতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তখন সাদা গিলাফ পরানো হয়। ৯ জিলহজ্জ সাধারণত নতুন গিলাফ পরানো হয় আর পুরানো গিলাফটি খন্ড খন্ড করে বিভিন্ন মুসলিম দেশকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। আর, এই গিলাফ পরিবর্তন ‘বনী শাইবাহ’ গোত্র দ্বারাই সম্পন্ন হয়ে আসছে।

৯ জিলহজ্জ, ১৪৪২ হিজরির গিলাফ পরিবর্তনঃ এ বছর পবিত্র মক্কায় হজ্জ পালন করেছে প্রায় ৬০,০০০ হাজি, যা সংখ্যায় কম করোনা মহামারীর জন্য। জানা যায়, এ বছর গিলাফে ব্যবহৃত খাঁটি রেশম আনা হয়েছে ইতালি থেকে। স্বর্ণ জার্মান থেকে আনা হয়েছে। এ বছর কাবার নতুন গিলাফের কাজ সম্পন্ন করতে প্রায় ২২ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল খরচ হয়েছে যা প্রায় ৯ কোটি ৭৪ লক্ষ ৭২ হাজার ৮ টাকা। দুই শতাধিক শ্রমিক সারাবছর কাবার গিলাফ তৈরির কাজে নিয়োজিত থাকেন।

কাবার নতুন গিলাফ তৈরিতে অংশগ্রহণ করেন যে আলেমঃ

পবিত্র কাবা ঘরের নতুন গিলাফ তৈরিতে অংশগ্রহণ করেছেন অল পাকিস্তান উলামা কাউন্সিলের সভাপতি’ শায়িখ হাফিজ মুহম্মদ তাহির আশরাফি’। গত ২২জুন, ২০২১ এ তাহির আশরাফির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল কাবার গিলাফ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনকালে তিনি গিলাফের শেষ সেলাই উৎপাদনে অংশগ্রহণ করেন।

পবিত্র কাবা শরিফের আবরণী যে গিলাফ বা কিসওয়া তা পরিবর্তনের ধারা এভাবেই অব্যাহত হয়ে আসছে। তবে নতুন নতুন প্রযুক্তি, কাপড়, নকশা ও সেলাইয়ের মাধ্যমে স্বর্ণখচিত গিলাফ তৈরি আরো সহজতর, সৌন্দর্য্যমন্ডিত করে তোলার প্রয়াস চলছে।

সূত্র সমূহঃ Wikipedia, বাংলা ট্রিবিউন, যুগান্তর, দেশরূপান্তর, N Gulf

Fazilatunnesa Emi

Ctec (14th batch)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author