Home Life Style & Fashion যে রং দিয়েছে প্রকৃতিঃ

যে রং দিয়েছে প্রকৃতিঃ


তুমি আকাশের বুকে

  বিশালতার উপমা'

কবি,ঔপন্যাসিক,গীতিকাররা তাদের প্রিয়জনদেরকে কতভাবেই না উপমায় সাজায়। তারা কাব্য করে বলেন, আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল।কিন্তু, প্রকৃতি থেকে উপমা ধার করে ঠিক কি রঙের পোশাক চাই তা কি আপনি-আমিও বলি না! বলি না, পেঁয়াজের খোসার যে নরম রং,সেটা কি পাওয়া যাবে? কৃষ্ণচূড়ার টকটকে লালটাই যে পছন্দ, আর কোনো লাল চলবে না।কাঁচা হলুদের যে উজ্জ্বলতা, তার তুলনা আর কোন রঙে?

প্রকৃতির রং গুলোই যেনো ঘুরেফিরে চাই পোশাকের রঙের ক্ষেত্রেও! ‘মেহেদির মতো চাপা খয়েরি ‘ বলে রং বোঝাতে হবে না। একদম মেহেদি থেকে তৈরি সেই রংটি ই পেয়ে যাবেন আপনার পছন্দের পোশাকের রঙে। কি অবাক হচ্ছেন?

কবি,ঔপন্যাসিক,গীতিকাররা যেভাবে উপমা দিয়ে গেছেন, সেই উপমারই যদি বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায় তবে তো তা ‘সোনায় সোহাগা’র মতো হবে। আর, এই উপমার বাস্তব প্রতিফলন যদি নিজের পছন্দের পোশাকে নিয়ে আসা যায়, তাহলে তো আর কথাই নেই!

কাপড় রঙ করার জন্য দুই ধরনের ডাই ব্যবহার করা হয়।

১| ন্যাচারাল ডাই

২|সিন্থেটিক ডাই

ন্যাচারাল ডাইঃ

প্রাকৃতিক উপাদান থেকে প্রাপ্ত যেসব রঙ দ্বারা কাপড় রং করা হয়, তাদেরকে ন্যাচারাল ডাই বলে। আর, এই উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে উদ্ভিদ, প্রাণী, পোকামাকড় এবং খনিজ উৎস হতে আহরণকৃত সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রঙ।

যদিও ন্যাচারাল ডাই আহরণের অনেকগুলো উপকরণ আছে আমাদের প্রকৃতিতে, কিন্তু সব ন্যাচারাল উপকরণ থেকে এই ডাই সংগ্রহ করা যায় না।

নিম্নোক্ত উপকরণগুলো থেকে আমরা সহজে ন্যাচারাল ডাই সংগ্রহ করতে পারিঃ

প্রানীজ উপকরণ থেকেঃ

১| লাল/রেড ডাইঃ টকটকে লাল রঁজক।

২|ইন্ডিয়ান হলুদ ডাইঃ গো মূত্র।

৩|লাল-বেগুনী ডাইঃ ল্যাক ইনসেক্ট।

৪|বেগুনী,আকাশী-নীল ডাইঃ পাথর শামুক।

৫|কালচে-বাদামী ডাইঃ অক্টোপাস, ক্যাটল ফিশ।

উদ্ভিজ্জ উপকরণ থেকেঃ

১|কমলা/অরেঞ্জ ডাইঃ গাঁজর,পেঁয়াজের খোসা।

২|ব্রাউন ডাইঃ ড্যান্ডিলিয়ন শিকড়, চা, কফি,শাবক।

৩|গোলাপী ডাইঃ গরুর মাংস, চেরি,লাল এবং গোলাপী গোলাপ।

৪|নীল ডাইঃ কুঁড়ি,লাল বাঁধাকপি,লাল শসা,ব্লুবেরি,বেগুনি আঙ্গুর।

৫|লাল-বাদামী ডাইঃ ডালিম,বীট,বাঁশ,হিবুসাস(লাল রঙের ফুল),জবা।

৬|গ্রে-কালো ডাইঃ ব্ল্যাকবেরি,আখরোট হুল,আইরিশ মূল।

৭|লাল-বেগুনী ডাইঃ লাল সুমাক বীজ, তুঁত পাতা, দিনফুল,পোকুইড বীজ,হকবেরি।

৮। সবুজ ডাইঃ সরল শিকড়, পেপারমিন্ট পাতা, লিল্যাক্স, ঘাস, নেট, কাঁঠাল, পীচ পাতা।

৯। হলুদ ডাইঃ বে পাতা, মরিগোল্ড, সূর্যমুখী পেটেলস, ড্যান্ডেলিয়ন ফুল, পেপারিকা, হলুদ, , মাহোনিয়ান শিকড়, বারবেরি শিকড়, হলুদ ডোরা শিকড়।

প্রকৃতির রঙঃ

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ তার সৃজনশীলতার প্রভাবেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে প্রকৃতির রঙকে ব্যবহার উপযুক্ত করার মাধ্যমে রাঙিয়েছে নিজের পোশাক-আশাককে। প্রাচীন কালে আদিম মানুষরা ন্যাচারাল পিগমেন্টের সাথে তেল ও জলের মিশ্রণেই তৈরি করতো ন্যাচারাল ডাই।যা বিভিন্ন আকার- আকৃতির নকশায় ফুটে উঠতো অতি মনোহররূপে। সেই ধারাবাহিকতায়, একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আদিম পুরুষদের সেই ছোঁয়া যেনো আজও বহন করে চলেছে আধুনিক যুগের মানুষেরা।

১৪৫৬ সালের পর থেকে কেমিক্যাল ডাই এর প্রচলন শুরু হয়। ক্রমেই তা টেক্সটাইল সোসাইটিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠে সহজ উৎপাদন প্রক্রিয়া , কম খরচে কাঁচামাল সংগ্রহ, রঙের গাঢ়ত্ব সব কিছু মিলেই। কিন্তু, এতোসব গুণ থাকা সত্ত্বেও কেমিক্যাল ডাই এর কিছু ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া রয়েছে।যে প্রতিক্রিয়ার স্বীকার হচ্ছে আমাদের পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র ও আমরা নিজেরাও।

নিজেদের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে, পরিবেশকে বাঁচানোর চিন্তার তাগিদে ,বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে তাই আজ ও বিদ্যমান রয়েছে ন্যাচারাল ডাই এর কদর।

এই ন্যাচারাল ডাই অদ্যাবধি তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে নানা দেশের নানা ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিতে।

যে ধরনের ফ্যাব্রিকে ন্যাচারাল ডাইং করা যায়ঃ

সাধারণত ন্যাচারাল ফাইবার থেকে তৈরি কটন,সিল্ক, উল এসব ফ্যাব্রিক ন্যাচারাল ডাইং এর জন্য সবচেয়ে ভালো।

প্রাকৃতিক উপাদান থেকে রং তৈরির প্রক্রিয়াঃ

প্রাকৃতিক উপাদান থেকে রং তৈরির প্রক্রিয়াটাও বেশ মজার।

রং তৈরির প্রক্রিয়া/ ডায়িং প্রসেসঃ

প্রাথমিক ধাপঃ

ডায়িং শুরু করার আগে ফ্যাব্রিক প্রস্তুত সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ । প্রথম, ফ্যাব্রিক ধুয়ে নিতে হবে যদিও এটি শুষ্ক করা যাবেনা – এটি ভিজা হতে হবে।তারপর একটা সলুশন তৈরি করতে হবে যেটা ফ্যাব্রিক টাকে ডাইং এর জন্য আরো উপযোগী করে তুলবে।যে ডাই টা ব্যবহার করতে চায়, তা যদি ‘বীজ’ থেকে তৈরি হয় তাহলে তার জন্য লবণ এবং অন্যান্য ‘উদ্ভিদ উপাদান’ থেকে যদি ডাই তৈরির ক্ষেত্রে ভিনেগার ব্যবহার করতে হবে।

এক ঘন্টার জন্য ফ্যাব্রিক টাকে তৈরিকৃত সলুশন এ ডুবিয়ে রাখতে হবে। তারপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। তারপর,ফ্যাব্রিক ডায়িং এর জন্য প্রস্তত হবে।

রং করার ধাপঃ

১।ডাইং শুরু করার আগে, সংবাদপত্রের মাধ্যমে কাজের এলাকাটা ঘেরাও দিতে হবে। না ঘরের অন্য যে কোন আসবাবপত্রে দাগ লাগতে পারে ।

২।একটি বড় গামলা বা পট এ( স্টেটেইনলেস স্টীল বা কাচের গামলা হলে বেশী ভালো হয়)র মধ্যে উপাদান স্থাপন করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, ডাইং পদার্থ গুলো পাত্র ও চামচে দাগ ফেলবে, তাই এটি শুধুমাত্র ডাইং এর জন্য এটি ব্যবহার করা উচিত।

৩।পানি দিয়ে গামলাটাকে পূরন করতে হবেএবং তাতে যে উপাদান থেকে কালার আনতে হবে সে উপাদান টা রাখতে হবে।

৪। এক ঘণ্টা বা ততক্ষণ পর্যন্ত সিদ্ধ করতে হবে যতক্ষণ না একটি সুন্দর গাঢ় রঙ পাওয়া না যায়।

৫। এরপর ডাই টা ছেঁকে আলাদা করে ডাই বাথে (বালতি / গামলাতে) নিতে হবে।

৬। তারপর ফ্যাব্রিক ডাই বাথ (বালতি / গামলাতে) এ রাখতে হবে এবং প্রায় ১ ঘন্টার মত আবার ফুটাতে হবে।

৭। ফ্যাব্রিকটি কিছুক্ষণ পরপর চেক করতে হবে। যখন এটি শুকিয়ে যায় তখন হালকা রঙ হবে। এক ঘন্টা ধরে ফুটালে চমৎকার রঙ আনা করা যায় ফ্যাব্রিকে। কিন্তু,তা হালকা রঙের হয়। গাড় রঙ পাওয়ার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।

৮।তারপর, যখন ফুটানো শেষ হবে তখন ফ্যাব্রিক টা গরম পানিতে কিছুক্ষণ পরিষ্কার করতে হবে। তারপর,ঠান্ডা পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে যখন সম্পূর্ণ কালার টা পেয়ে পাওয়া যাবে।

এভাবেই, ন্যাচারাল ডাই দিয়ে ফ্যাব্রিকে বা সুতায় রং দেওয়া হয়ে থাকে। রং করে ধুয়ে দেওয়া কাপড় থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে ন্যাচারাল ডাই এর যাত্রাঃ

আশির দশকের শুরুতে ‘ বিসিক’ এর উদ্যোগেই বাংলাদেশে প্রথম প্রাকৃতিক রং নিয়ে কাজ শুরু হয়। সেই সুবাদেই আমাদের দেশে প্রাকৃতিক রং নিয়ে কাজের কথা বললে রুবী গজনবী আর তার প্রতিষ্ঠা করা ফ্যাসন হাউস ‘অরণ্য’র কথা আসে। মূলত প্রাকৃতিক রং নিয়েই কাজ করে তারা।১৯৯০ সালে অরণ্যের যাত্রা শুরু হয়। এছাড়া, আড়ং,কুমুদিনী -এই ফ্যাশন হাউসগুলো ও প্রাকৃতিক রং নিয়ে কাজ করে আসছে। দেশি উপকরণ নিয়ে কাজ করে এ ধরনের বড় সব ফ্যাশন হাউসের কিছু না কিছু কাজ থাকে প্রাকৃতিক রং নিয়ে।

দেশাল,যাত্রা,বনজ-এই ফ্যাশন হাউসগুলোর নিয়মিত আয়োজনই থাকে ন্যাচারাল ডাই এর পোশাক নিয়ে।

ন্যাচারাল ডাইয়ের পোশাকের চাহিদাঃ

শৌখিন মানুষের ক্লজেটে অনেক আগ থেকেই জায়গা করে নিয়েছে জামদানি, সিল্ক বা মসলিনের পাশাপাশি একটি দুটি প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো শাড়ি। বাংলাদেশে তৈরি প্রাকৃতিক রঙের পোশাকের চাহিদা বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও প্রচুর। এসময়ের তরুণ -তরুণীদের কাছেও এই প্রাকৃতিক রঙের পোশাকের চাহিদা বেশ। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ঈদ, পূজা,জাতীয় দিবসগুলোকে এই ধরনের পোশাকের চাহিদা যেনো আরো বেড়ে যায়।এই পোশাকে যেনো ফুটে উঠে আভিজাত্যের ছোঁয়া এবং পরতেও আরামদায়ক।

প্রকৃতির রঙের ছোঁয়াঃ

শিবোরি, টাই-ডাই ইত্যাদি নকশার কাজ হচ্ছে প্রাকৃতিক রঙের পোশাকে। কাঠের বোতাম, কড়ি,লেস,এমব্রয়ডারি ইত্যাদি ধরন যোগ করেও ভিন্নতা আনা হচ্ছে এসব পোশাকে। তবে খুব ঝলমলে কোনো কিছুই মানায় না এমন পোশাকে। চকমকে চুমকি,পাথরের কাজ এতে থাকে না। এর সাদামাটা আভিজাত্যই একে করে তুলেছে অনন্য।

ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতামতঃ

পরিবেশ বান্ধব যেকোনো মানুষই উৎসাহী হবেন এ রঙের পোশাক ব্যবহারে। একটি টি-শার্টের কৃত্রিম রং বসাতে ব্যবহার করতে হয় ১৬ থেকে ২০ লিটার পানি। ৮০ শতাংশ রং যায় কাপড়ে। বাকিটা বর্জ্য হিসেবে ফেলা হয় পরিবেশে। ২০০৬ সালে ‘ওয়েল ড্রেসড’ শিরোনামে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করে।

রাসায়নিক রঙের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা চিন্তা করলে প্রাকৃতিক রং কে চমৎকার বিকল্প হিসেবেই দেখা যায়। কিন্তু, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ফ্যাশন বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন যে, রাসায়নিক রঙের বদলে পুরোপুরি প্রাকৃতিক রং ব্যবহার এখনই সম্ভব নয় উৎপাদন স্বল্পতার কারণে।

সূত্র সমূহ: Textile and Dyeing, Banglapedia,Wikipedia, Food Textile

Fazilatunnesa Emi

CTEC(14th batch)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author