Home Textile Manufacturing Printing সূঁচে প্রাচীনত্ব সেলাই-মেশিনে নতুনত্ব

সূঁচে প্রাচীনত্ব সেলাই-মেশিনে নতুনত্ব

প্রাত্যহিক জীবনে আমরা যেসব পোশাক পরিধান করি, সেগুলোর প্রতিটিই তৈরির পেছনে থাকে বহু ইতিহাস ও কাব্য। সেলাইয়ে সৃজনশীলতা যেন প্রতিটি কাপড়কে দান করে এক অনন্য মাত্রা। আর যখন-ই কথা আসে সেলাইয়ের,তখন-ই মনে পড়ে যায় আগেকার বর্ষার দিনগুলোতে নানি-দাদিদের একসাথে মিলে সুঁইয়ের প্রতিটি ফোঁড়নে তুলে ধরা জীবন ও অভিজ্ঞতার আলোকে নানাবিধ বৈচিত্র্যের কথা। ছোটবেলায় মায়ের হাতে সেলাই করা পোশাক, এতো আজকের দিনে এসে আমাদের জন্য রীতিমতো এক আবেগের নাম। প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরেই থাকতো একটি করে সেলাই মেশিন। তাদের সৃষ্ট কারুকাজগুলো যেন তুলে ধরতো কোনো এক রাজ্যের অপ্রকাশিত গল্প কিংবা কাব্যিক রচনাসমূহকে। তো চলুন পুরানো আবেগ ঘেঁটে সেলাই মেশিনের দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া যাক আর জানা যাক এর ইতিহাস ও বিবর্তন প্রক্রিয়া সম্পর্কে-

প্রাচীন প্রস্তরযুগে মানুষ পশু শিকার করে জীবন যাপন করতো। তারা পশুর চামড়াকে যুক্ত করতে প্রাণীর হাড়, হরিণের শিং এবং হাতির দাঁত সূঁচ হিসেবে ব্যবহার করতো। আনুমানিক ২০০০০ বছর আগে মানুষ হাত দিয়ে সেলাই শুরু করে। ব্রোঞ্জ যুগে ধাতুর তৈরী সূঁচের প্রচলন ঘটে। তার-ই ধারাবাহিকতায়,লৌহযুগে রোমানরা লোহা ও হাতির দাঁতের সুঁই ব্যবহার করলেও রাজকীয় কাজে রূপার সুঁই ব্যবহার করতো। সর্বপ্রথম আরবের মুসলিম চিকিৎসকরা শল্যচিকিৎসায় সুঁই ব্যবহার করেন যা ছিলো স্টিলের তৈরি। গর্তযুক্ত প্রথম সূঁচের উদ্ভব হয় খ্রীস্টপূর্ব ১৭৫০ সালের দিকে, এরপর সময়ের সাথে সাথে আসে কপার ও ব্রোঞ্জের সূঁচ। খ্রিস্টাব্দ ৬০ এর দিকে ফিজিয়ার সূচিকর্ম আবিষ্কার হলেও সুঁই চীন দেশে প্রবেশ করে আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্টাব্দে। এরপর ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে স্টিফান বেইসেল জার্মানিতে একটি সূঁচের কারখানা স্থাপন করেন। সময়ের সাথে সুইঁয়ের বিভিন্ন পরিবর্তন সাধিত হলেও বর্তমান সময়ে যেসব সুঁই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- এমব্রয়ডারি সূচঁ, কুইলটিং সূচঁ, মিলিনারের সূচঁ, বাঁকা সূচঁ, বিডিং সূচঁ, চেনিলে সূচঁ, টেপস্ট্রি সূচঁ ইত্যাদি।

সুই সুতার বুননে তৈরি পোশাক ছিল মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের একঘেয়েমি দূর করে ধীরে ধীরে এই সময় সাপেক্ষ সুই সুতার যুগ পেরিয়ে এলো সেলাই মেশিন। যার ফলস্রুতিতে,আধুনিক ও মার্জিত পোশাক তৈরি হয়ে গেল খুবই সহজসাধ্য একটি ব্যাপার। একটি সেলাই মেশিন একজন নারীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সেজন্যই দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি উদ্যোগে এখনো মহিলাদের সেলাই মেশিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সেলাই মেশিন আবিষ্কারের ইতিহাস ঠিক যেন সুতোর বুননে ঠাসা এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের নাম। ১৮০০ সালের দিকের কথা,তখন মানুষ চাইলেও নিজেদের প্রয়োজনীয় পোশাক কিনতে পারতো না। ইংল্যান্ডের চার্লস ফ্রেডরিক ১৭৫৫ সালে প্রথম সেলাই মেশিন ও প্যাটেন্ট আবিষ্কার করেন। ব্রিটিশ নাগরিক থমাস সেইন্ট ১৭৯০ সালে সেলাই মেশিনের ১ম নকশা তৈরি করে এবং এর প্রায় ৪০ বছর পর ১৮৩০ সালে ফরাসি দর্জি বাথেলেমি হিমোনিয়ার প্রথম কার্যকরী সেলাই মেশিন তৈরি করেন। বানিজ্যিকভাবে প্রথম সেলাই মেশিনের যাত্রা শুরু হয় ১৮৫১ সালে। এই মেশিন তৈরিকারী “আইজাক মেরিট সিঙ্গার”-কে আধুনিক সেলাই মেশিনের পথিকৃৎ বলা হয়। প্রধানত দুই ধরণের সেলাই মেশিন দেখা যায়-
১.ম্যানুয়ালি অপারেটেড মেশিন (Manually Operated Machine);
২.ইলেক্ট্রিক্যালি অপারেটেড মেশিন (Electrically Operated Machine).

বাসাবাড়িতে যে সেলাই মেশিন দেখা যায় তা মূলত ম্যানুয়ালি অপারেটেড মেশিন। বর্তমান সময়ে যে ব্রান্ডগুলো এ ধরণের মেশিন তৈরি এবং রপ্তানি করে থাকে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সিঙ্গার, বাটারফ্লাই, সোয়ান, Elna ইত্যাদি। এই মেশিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো হলো-নিডেল, নিডেল প্লেট, নিডেল বার, নিডেল ক্ল্যাম্প, ফিড ডগ, প্রেসার ফুট, প্রেসার বার, প্রসার ফুট লিফটার ইত্যাদি।

কার্যপ্রক্রিয়াঃ সেলাই মেশিন হলো এমন একটি মেশিন যা সুতার সাথে কাপড় এবং উপকরণগুলি একসাথে সেলাইয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। মূলত একটি হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে বা পা চালিত ট্রেডল পরিচালনার মাধ্যমে ম্যানুয়ালি অপারেটেড মেশিনে সেলাই করা হয়।

কিন্ত বর্তমানে প্রযুক্তির এই যুগে, হাত ও পা দিয়ে চালানো সেইসব সেলাই মেশিন প্রায় বিদায় নিলেও তাদের জায়গাটি ঠিক-ই দখল করে নিয়েছে আধুনিক সব ইলেকট্রিক সেলাই মেশিন। আকারে ছোটখাটো ও সহজে বহনযোগ্য এই ইলেক্ট্রিক মেশিনটি মূলত চীনাদের দ্বারাই উন্নিত হয়ে মাত্র ১৯.৫ সেমির যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। তবে এর কার্যক্ষমতাও বেড়েছে বহুগুণ। ব্যাটারী অথবা অ্যাডাপ্টরের মাধ্যমে পরিচালিত এই মেশিনের সাথে থাকে একটি ফুট প্যাডাল, একটি সুঁই, চারটি মেটাল।
ইন্ডাস্ট্রিতে শ্রমিকদের সুবিধার্থে ও সেলাই প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করতে অত্যাধুনিক মেশিনগুলো অপরিহার্য ভুমিকা পালন করছে। বর্তমানে গার্মেন্টস শিল্পের জন্য আবিষ্কৃত সর্বশেষ ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মেশিনগুলো আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আধুনিক সেলাইমেশিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- Brothers Sewing Machine, Heureux sewing Machine, Magicfy Mini Sewing Machine, Haitral Mini Sewing Machine, Singer–2277 Sewing Machine ইত্যাদি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সিংহভাগ-ই আসে পোশাক শিল্প থেকে। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ আমাদের দেশ থেকে কম মজুরিতে কাপড় তৈরি করে নেয়। প্রযুক্তির এই যুগে,পোশাক শিল্পের উন্নতির ধারার নিকট আধুনিকতার ছোয়া যেন এক সোনার হরিণ! ভালো মানসম্পন্ন পোশাক তৈরিতে এডভান্স টেকনোলজির বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে এসব আধুনিক মেশিনে আমদানি নির্ভর না হয়ে, দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা বাংলাদেশের অর্থব্যবস্থাকে নিয়ে যাবে এক অন্যরকম উচ্চতায়। তাহলেই উন্নতি ও সমৃদ্ধিতে এগিয়ে যাবে আমাদের সোনার বাংলাদেশ।

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া, বাংলানিউজ ২৪, Contrado, The Spruce, Textile Conservation Studio

Written Studio

  1. Mst Afsana Akter Urme
  2. Alia Yasmin
  3. Jeba Yasmin Borsha
  4. Monira Moula
  5. Jannatuz Faria
  6. Sadia Naznin Ria
  7. Arpita Saha
    Dr. M A Wazed Miah Textile Engineering College

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author

error: Content is protected !! Don\\\\\\\\\\\\\\\'t Try to Copy Paste.