Monday, June 24, 2024
More
    HomeTraditional Textileকার্পেটের/গালিচার আদ্যোপান্ত (পর্ব -৩)

    কার্পেটের/গালিচার আদ্যোপান্ত (পর্ব -৩)

    নানান দেশের নানান কার্পেট  :

    ইরান

    কার্পেট এর কথা বলা হবে সেখানে প্রাচীন পারস্য( বর্তমান ইরান) এর কার্পেট থাকবে না, এ হতেই পারে না। ধারণা করা হয় যে, প্রাচীনকালে কার্পেট তৈরীতে অন্যন্য এই ইরান। প্রাচীনতম ” “পাজেরিক কার্পেট ”ও এই ইরানে ( প্রাচীন পারস্য) এ তৈরি বলে প্রমান পাওয়া যায়। বর্তমান বিশ্বের সবথেকে বড় হাতে বোনা কার্পেট আরব আমিরাতের বড় মসজিদ,  “শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ”  এর কার্পেট ডিজাইনারও ইরানি আল খালিকি। “ইরানের হাতে বোণা কার্পেটের বিশ্বকোষ” গবেষণালব্ধ গ্রন্থটি লিখেছেন বিখ্যাত গবেষক ও লেখক ডক্টর হোসাইন তাজাদ্দোদ। এই বইটির ভূমিকায় লেখক লিখেছেন: সেই প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্ববাসী ইরানকে চেনে দুটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পের কারণে। একটি কবিতা আরেকটি কার্পেট।

     পূর্বের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সম্রাট সাইরাস ব্যাবিলন আক্রমণ করলে তিনি সেখানকার গালিচাশিল্প দেখে মুগ্ধ হন এবং ঐতিহাসিকদের মতে, তিনিই পারস্যে গালিচা শিল্পের পত্তন ঘটান। এরপরে বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গালিচা শিল্প হস্তান্তর হতে থাকে। ৬২৮ খ্রীষ্টাব্দে বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিউস আক্রমণ করেন সাশানদের রাজধানী তিসফুন (Ctesiphon), সেখান থেকে তিনি বহু কার্পেট নিয়ে যান।এরপর ৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দে আরবি সাম্রাজ্য সাশানদের উপর আক্রমণ করে এবং তারাও একাধিক বৃহদাকার গালিচা নিয়ে ফিরছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল খসরুর বসন্ত গালিচা, এর আয়তন ছিল লম্বায় ও চওড়ায় ২৭ মিটার। এতই বড় গালিচা ছিল যে সম্রাট খশরু তাঁর বাগান জুড়ে শীতকালে এটি বিছিয়ে রাখতেন বসন্তকে আহ্বান করার জন্য। পরে আরবদের হাতে পরলে এটিকে টুকরো টুকরো করে কেটে তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।১০৩৮ থেকে ১১৯৪ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত সেলজুকরা পারস্যে রাজত্ব করে। তারপর মঙ্গলরা পারস্য দখল নেয়। নৃশংস মঙ্গলদের হাতে এই শিল্প অনেকটাই ধ্বংস হয়ে যায় যদিও তারাও প্রাসাদ সাজাতে এই গালিচাই ব্যবহার করত। গালিচা শিল্পের অবস্থা কিছুটা ফেরে মঙ্গলদের শেষ গুরুত্বপূর্ণ শাসক শারুখের হাত ধরে। যদিও তিনি গালিচা শিল্পের বিশেষ মানোন্নয়ন করেননি তবে একথা বলা যেতেই পারে যে পূর্বপুরুষদের ধ্বংসলীলার প্রায়শ্চিত্ত করেছেন।ষোড়শ শতাব্দিতে পারস্যের গালিচা খ্যাতি ও উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছায়। এই সময়ের সাফাভি রাজবংশ গালিচার নকশার উন্নতির জন্য বহু পরীক্ষানিরীক্ষা চালায় এবং এর জন্য নির্দিষ্ট কর্মচারী রাখে। এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন সম্রাট শাহ আব্বাস, যিনি ইউরোপের সাথে বাণিজ্যসম্পর্ক স্থাপন করেন এবং গালিচাকে পশ্চিমের একটি জনপ্রিয় বিলাসদ্রব্যে পরিণত করেন। 

    ইরানি কার্পেট কেবল একটি পণ্যই নয় এটি একটি শিল্প, সৃজনশীল শিল্প। ইরানি জাতীয় সংস্কৃতির সমষ্টিগত একটি অভিব্যক্তি ও প্রতীক এই কার্পেট। ইতিহাসের দীর্ঘ কাল পরিক্রমায় এই শিল্পটি ইরানের ঐতিহ্যকে বিশ্বব্যাপী সমুন্নত রেখেছে। বিশ্বব্যাপী আজ তাই ইরানের কার্পেট শিল্পের খ্যাতি অনন্য। কোনো ইরানির ঘরে কার্পেট নেই, এটা ভাবাই যায় না। কার্পেটবিহীন ইরানি বাসা মানেই প্রাণহীন।

    ঐতিহ্যবাহী এইসব ইরানি কার্পেটের মধ্যে রয়েছে – আর্দেবিল গালিচা, চেলসি গালিচা, শেকারগহ গালিচা, ফুলুনজি গালিচা ইত্যাদি। আর্দেবিল গালিচা ইরানের প্রাচীনতম আরেকটি কার্পেট। এই কার্পেট এখন লন্ডনের “ভিক্টোরিয়া ও আলবার্ট ” মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। 

    ডিজাইন ও বুণনের দিক থেকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও শৈল্পিক একটি কাজ বলে পরিগণিত হয় এই আর্দেবিল কার্পেট। ১৫৩৯ সালে বোণা হয়েছে এই কার্পেটটি। 

    চেলসি গালিচাও অপর একটি বিখ্যাত ইরানি কার্পেট। এই কার্পেটটিও “ভিক্টোরিয়া ও আলবার্ট ” মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। এই কার্পেটটি ‘কিংস চেলসি’ সড়কের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কেনা হয়েছিল বলে একে চেলসি কার্পেট বলা হয়। রূপকথার অনেক জন্তু জানোয়ারসহ, নানা বুনো পশুর, জীবজন্তুর ছবি আঁকা রয়েছে এই কার্পেটে।

    আরেকটি জনপ্রিয় কার্পেটের নাম ‘শেকারগহ গালিচা’। ভিয়েনার শিল্প জাদুঘরে এই ইরানি কার্পেটটি শোভা পাচ্ছে। এই গালিচাটি সম্পূর্ণ রেশমি সূতোয় বোণা। শাহ আব্বাস সাফাভির আমলে অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় ষোল শতকের শুরুর দিকে এই কার্পেটটি বোণা হয়েছিল। ইরানি এই শাহ কীভাবে শিকার করতো সেই দৃশ্য সুন্দর করে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই কার্পেটে।

    সাফাভি শাসনামলের আরেকটা গালিচার নাম ‘ফুলুনজি গালিচা’।  পোল্যান্ড থেকে এই ফুলুনজি শব্দটি এসেছে বলে অনেকের ধারণা করা হয়। ফুল, লতাপাতার ডিজাইনে তৈরী এই শ্রেণীর কার্পেটগুলো। আমেরিকার নিউইয়র্ক মেট্রোপলিটান মিউজিয়ানে রয়েছে ইরানের অন্তত দুই জোড়া বিখ্যাত কার্পেট। যা এই ইরানের ফুলুনজি কার্পেট। পোল্যান্ডের শাহজাদা চরতোরিস্কির রাজ পরিবারের সঙ্গে মিল রয়েছে-এরকম একটি ডিজাইনের কার্পেট সর্বপ্রথম প্যারিসের আন্তর্জাতিক মেলায় প্রদর্শনী করা হয়েছিল ১৮৭৮ সালে। সেই থেকে এই কার্পেট ‘লাহেস্তানি’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ফার্সি ভাষায় পোল্যান্ডকে লাহেস্তান বলা হয়। তবে পরবর্তীকালে রিগ্যাল নামের এক গবেষক গবেষণা করে এই কার্পেট পোল্যান্ডের বলতে নারাজ। এরপর মার্টিন এবং বোড নামের আরও দুই গবেষক বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে বলেছেন যে : নি:সন্দেহে ওই কার্পেট ইরানি। কারণ,  এই শ্রেণীর কার্পেটগুলো ইরানের রাজ প্রাসাদের জন্য বোণা হত। তৎকালীন রাজা বাদশাহরা ইউরোপীয় শাসকদেরও এইসব কার্পেট উপহার দিতেন।

     তাই,  আমেরিকার নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম, ক্লিভল্যান্ড আর্ট মিউজিয়াম, সান মার্কো গির্জা, মিউনিখের রেসিডেন্স প্যালেস, ডেনমার্কের রোজেনবার্গ ক্যাসল’সহ বিশ্বের আরও বহু মিউজিয়ামে ইরানি কার্পেট দেখতে পাওয়া যায়।

    পারস্যে আরবী রাজত্ব শেষ হয় সেলজুক জাতির আক্রমণের মধ্যে দিয়ে। পারস্যের গালিচার মান উন্নয়ন ও বিশ্বব্যাপি প্রচারে এই সেলজুকদের ভূমিকা ছিল প্রধান। সেলজুক জাতির মেয়েরা গালিচার বুননে অসামান্য পারদর্শী ছিল। আজারবাইজানের মতো দেশে আজও এই শিল্পকুশলতা চোখে পরে। বাঙালি নারীরা যেমন নকশিকাঁথার সেলাই করে সেইরকম এখনো ইরানি মেয়েরা তাদের ঘরে বসে গালিচা বুনে থাকেন। মূলত ইরানের এই মেয়েদের জন্যই আজও এই শিল্প ইরানের বিশ্বের সেরা কার্পেট বুননকারী দেশ হিসেবে বিবেচিত করে। এখন এই বিশ্বায়নের যুগেও তারা এখনো হাতে বোনা কার্পেট বানায়, যা সত্যিই অকল্পনীয়। 

    মিশর : 

    ইসলামী বিশ্বের কার্পেট বললে, ইরানের পর আসে মিশর। কারণ,  মিশরীয় কার্পেট অসাধারণ মানের ও আলাদা এবং একটি বড় মাত্রায় উৎপাদিত হয়। তার অনন্য নমনীয়তা , কার্পেটের প্রাথমিক রূপগুলি জ্যামিতিক ডিজাইনগুলি দেখায় । মিশরীয় কার্পেট আক্ষরিক অর্থে ইস্তানবুলের কাছে তাদের উইংস মোকাবিলা করেছিল, এবং তারপর কায়রোতে নিজেকে খুঁজে পেল। কায়রো থেকে কার্পেটগুলি পূর্বের তুর্কিস্তানে পাওয়া যেতে পারে এমন খুব অনুরূপ। এছাড়াও পিরামিডের দেশ বলে সেই পিরামিডের রাজা ফেরাউনের শাসনব্যবস্থা চর্চার প্রায়শই ছাপ পাওয়া যায়।

    একটি নিয়ম হিসাবে, উল, মিশরীয় কার্পেট এবং প্রাসাদ থেকে বোনা অ্যানিমেট্রিক নোড বা Hyradas নোড ব্যবহার করে নির্মিত হয়। একসময় এটি লাল গালিচার পটভূমির জন্য, মিশরীয় কার্পেট জন্য খুব জনপ্রিয় ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, মিশর থেকে রেড কার্পেট তৈরির বা ব্যবহারকে নির্দেশ করে এমন কোন দলিল নেই। তবুও, মিশরীয় চিত্তাকর্ষক হস্তনির্মিত কার্পেট সারা বিশ্বে পরিচিত।

    চীন

    চীন বিশ্বের এমন একটা দেশ যারা প্রায় সবজায়গাতেই, সব সেক্টরে ধরে রেখেছে অনবদ্য রাজত্ব। চীনের কার্পেটগুলি বিশ্বের অন্য ধরনের কার্পেটগুলির মধ্যে অসামান্য। তাদের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য রঙের উদ্দেশ্য এবং রক্ষণশীল পছন্দ। চীনা কার্পেটগুলো যেন ভাষার মিশ্রণে তৈরি তারা যেন কথা বলে, তা ফুল হোক কিংবা জ্যামিতিক প্যাটার্ন উভয়ই হতে পারে। তাদের শৈলী ইসলামী দেশে কার্পেট শৈলী থেকে খুব ভিন্ন।বিস্ময়করভাবে, চীনের কার্পেটাক্টগুলি ১৭০০ এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত শিল্পের একটি রূপ হিসাবে বিবেচিত হয় নি। কার্পেটের উত্থানকাল অন্য কোনও পূর্বের দেশের তুলনায় অনেক পরে ঘটেছিল। এর কারণ, তখন চীনে উলের অভাব ছিলো। 

    সুন্দর চীনা কার্পেটগুলি হচ্ছে রং এর এক চমৎকার সমন্বয়, তারা সাধারণত একটি কার্ভিলিনের চরিত্র আছে এমন বিমূর্ত জ্যামিতিক আকার চিত্রিত করে। যার ফলে, রংগুলির মিশ্রণটি কোনও বিভ্রান্তি তৈরি করে না, একটি স্বতন্ত্র শৈলী এখানে সনাক্ত করা হয়, যা নিসন্দেহে শৈল্পিক এবং মার্জিত।

    এছাড়াও চীনের কার্পেটগুলিতে একটি নিয়ম হিসাবে চিত্রিত হয় প্রকৃতি ও বিশ্ব , প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনী, বৌদ্ধধর্ম ও তাদের ধর্মীয় নিদর্শন বা প্রতীক প্রদর্শন করে। আগ্রহজনকভাবে, প্রতিটি প্রতীক একটি বিশেষ অর্থ বহন করে, সেইসব সংকেতলিপির অর্থোদ্ধার করা এত সহজ নয়।

    তুরস্ক: 

    তুর্কি কার্পেট সাধারণত স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়। ইসলামী সংস্কৃতির দ্বারা অনুপ্রাণিত সমস্ত কার্পেট জ্যামিতিক আকার বা প্রতীককে চিত্রিত করে। 

    তুর্কির কার্পেটগুলির তূলনামূলক উজ্জ্বল আকর্ষণীয় উপাদান একটি শক্তিশালী টোনার সাথে একটি প্রাণবন্ত রঙ প্যালেট দিয়ে বানানো হয়।  টিন্টগুলি লাল, নীল, হলুদ থেকে অন্যান্য উষ্ণ ছায়া থেকে পরিবর্তিত হয়।

    বর্তমানে যুগে কার্পেট চাহিদা দেখে সেই পশ্চিমা বিশ্বের মার্কেট ধরার জন্য মুখিয়ে আছে বহু দেশ। বর্তমানে নতুন কার্পেট উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় রয়েছে – যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য , ভারত , আফগানিস্তান,পাকিস্তান, আর্মেনিয়া, তুরস্ক, স্পেন, ফ্রান্স, আজারবাইজান, বেলজিয়াম। বাংলাদেশে তেমনভাবে শুরু না হলেও লোকাল মার্কেটে কার্পেট পাওয়া যায়। 

    References : 

    1. Irani Carpet ( Part 1&2) by Nasir Mahmud and Abu Said on Pars Today 
    2. Prothom Alo Online Portal 
    3. Daily Bangladesh Protidin
    4. Salam web Today
    5. Textile Today 

    Written by: 
    Md. Nazmul Hasan Nazim 
    Member of TES
    National Institute of Textile Engineering and Research

    RELATED ARTICLES

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    - Advertisment -

    Most Popular

    Recent Comments