কালজয়ী মসলিনের পুনঃআবির্ভাব

0
457

প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপাদান যেমন গাছ, ফুল, প্রানি, খনি ইত্যাদি থেকে যেসব ফাইবার আহরন করে তাদেরকে ন্যাচারাল ফাইবার বলে। প্রকৃতপক্ষে ন্যাচারাল ফাইবার আমরা প্রকৃতির সমৃদ্ধ রত্নভাণ্ডার থেকে সংগ্রহ করি। ন্যাচারাল ফাইবার আমাদের পরিধেয় বস্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ। বাংলাদেশে ন্যাচারাল ফাইবারের সম্ভাবনা অপরিমেয়। কিন্তু আমাদের দেশে কলাগাছ, রেশম, ধইঞ্চা ইত্যাদির কদর নেই। আমরা যখন দেশের গন্ডী পেরিয়ে বিদেশের দিকে তাকাই তখন দেখতে পাই, এগুলোর ফাইবারে তৈরি হচ্ছে ‘গ্রিন হ্যান্ডিক্রাফটস’ l সারা দেশে এসব সম্ভাবনাময় খাতকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠতে পারে ছোট ছোট ট্র্যাডিশনাল ইন্ডাস্ট্রি। স্বাবলম্বী হতে পারে পিছিয়ে পড়া মানুষ ও নৃগোষ্ঠী। ঠিক এমনি অবহেলার কারণে আমদের দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়েগিয়েছিল মসলিন। একদল গবেষকের কঠোর পরিশ্রমে আমরা অতিতের সেই ঐতিয্যবাহি মসলিন ফিরে পেয়েছি। এতে বাংলাদেশ আবারও নতুন করে মসলিনের স্বর্ণালি অধ্যায়ে পা রাখার এক অপার সম্ভাবনার সুযোগ পেয়েছে। আমাদের ন্যাচারাল ফাইবার দেশীয় তুলা আজ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে, যা পুনরুদ্ধারের তাগিদ কোথাও নেই।

বিশ্বজুড়ে আর্টিফিশিয়াল ফাইবারের ভয়ংকর ক্ষতির ব্যাপারে সবাই সচেতন হচ্ছে। কেননা, এটা শরীর ও পরিবেশ- দুটোর জন্যই বিপজ্জনক। সেদিক থেকে ন্যাচারাল ফাইবার বা প্রাকৃতিক তন্তুর বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে ফিলিপাইন। আনারস পাতার ফাইবারের নাম সেখানে ‘পিনা ফ্যাব্রিকস’; এটি পেয়েছে স্পেশাল ফ্যাশন প্রডাক্টের স্বীকৃতি। শুধু তা-ই নয়, ‘গ্রিন হ্যান্ডিক্রাফট’ লেবেলে সে দেশের পণ্য বিশ্বব্যাপী বাজারজাত হচ্ছে। এতে দেশটি যেমন লাভবান হচ্ছে, তেমনি সেখানকার পরিবেশও রক্ষা পাচ্ছে।
ন্যাচারাল ফাইবার নিয়ে আজ পর্যন্ত যত কাজ, সব ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু হয়েছে। ন্যাচারাল ফাইবার যদি সরাসরি উৎপাদন সম্ভব না হয়, তবে এর কাঁচামালও অনেক লাভজনক। কারণ, এটি রপ্তানিযোগ্য। পাটের সুতায় এ দেশে কৃত্রিম আঁশের বিকল্প হিসেবে পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এমনকি বিদেশের বহু বিখ্যাত গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের পাট দিয়ে তৈরি করছে গাড়ির অভ্যন্তর। আবার প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি পণ্য ব্যবহারের সুখ দুনিয়াতে খুব কমই আছে। অর্থাৎ বলা যায় যে ন্যাচারাল ফাইবারের ব্যবহার যেমন মানব পরিবেশের জন্য দরকারি ঠিক তেমনি মানব শরীরের জন্যও উপকারিl

বিভিন্ন রকমের ন্যাচারাল ফাইবার রয়েছ। যেমন- কটন সিল্ক, জুট ইত্যাদি। টেক্সটাইল জগতে কটনের ভূমিকা অনেক বড় । কটনকে ফাইবারের রাজা বলা হয়।বাজারে 135 টির ও বেশী ধরনের সুতির জাত পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি অন্যতম জাত হলো মসলিন । আজ হতে প্রায় 200 বছর আগে ঢাকাই মসলিন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ফেব্রিক। একসময়ের এই জনপ্রিয় মসলিন কালের বিবর্তনে হারিয়ে গিয়েছে। ঐতিহ্যের দিক থেকে মুসলিম আমাদের কাছে এক আশাব্যঞ্জক এর নাম। কারণ এই সমৃদ্ধ মসলিনের বিলুপ্তি ঘটেছে আজ থেকে প্রায় বহু বছর আগে। সেই বছর কয়েক আগের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী বাংলার গৌরব, মসলিনের পুনরাবির্ভাব এর সম্ভাবনা পুনরায় জেগে উঠছে। এই মসলিন জাতিকে গৌরবের দিকে ধাবিত করবে।বাংলার ঐতিহ্য পরম্পরায় মসলিন

বাংলার অনন্য এক ঐতিহ্যের নাম মসলিন। হাজার বছর পুরনো এর ইতিহাস। মুঘল সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে পুরো ইউরোপে এর ব্যবহার ছিল বিস্তৃত। অতি স্বচ্ছ এই মসলিন প্রস্তুত করা হত পূর্ব বাংলার সোনারগাঁও অঞ্চলে। মসলিন বিশেষ এক প্রকার তুলার আঁশ থেকে প্রস্তুতকৃত সূতা দিয়ে বয়ন করা এক প্রকারের অতি সূক্ষ্ম কাপড়বিশেষ যা ঢাকাই মসলিন নামেও সুপরিচিত । মসলিন মুলত ফুটি কার্পাস নামক তুলা থেকে প্রস্তুত অতি চিকন সুতা দিয়ে তৈরি। মেঘনা নদীর তীরে জন্মানো এক বিশেষ ধরনের গাছ থেকে পাওয়া দুর্লভ এক তুলা দিয়ে বানানো হতো মসলিন।এর জন্য সর্বনিম্ন ৩০০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করা হত যার ফলে মসলিন হত কাচের মত স্বচ্ছ । তখনকার দিনে এক গজ ঢাকাই মসলিনের দাম ছিল ৫০ থেকে ৪০০ পাউণ্ড পর্যন্ত – আজকের মূল্যমানে ৭,০০০ থেকে ৫৬,০০০ পাউণ্ড।

মসলিন বানানোর জন্য ১৬টি আলাদা ধাপ সম্পন্ন করতে হত l প্রথমে, সুতার বলগুলোকে স্থানীয় লেক অথবা নদীর বোয়াল মাছের চোয়াল দিয়ে পরিষ্কার করা হতো। পরের ধাপ ছিল সুতা ঘোরানো। এ কাজটি করার জন্য উচ্চমাত্রার আর্দ্রতা প্রয়োজন হতো। এই সুতোর তন্তুগুলোর মধ্যে ছোট ছোট অসংখ্য সংযুক্তি থাকত। যার সাহায্যে এগুলো একসঙ্গে জোড়া লাগানো থাকত। কাজ শেষে সুতার পৃষ্ঠে রুক্ষ এক ধরনের ভাব আসত, যা ধরলেও ভালো লাগত।সর্বশেষে আসত বুনন প্রক্রিয়া। এই ধাপে কাজের সময় এক মাসও লেগে যেত।

নানা কারণে আঠারো শতকের শেষার্ধে বাংলায় মসলিন বয়ন বন্ধ হয়ে যায়।২০ শতকের শুরুর দিকে, বিশ্বের প্রতিটি কোণ থেকে ঢাকাই মসলিন অদৃশ্য হয়ে যায়। মসলিন বানাতে ‘গসিপাম আরবোরিয়াম ভার’ (স্থানীয় নাম ফুটি কার্পাস) নামে যে তুলা ব্যবহার করা হতো, সেটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়।

মসলিন – নামটার সাথেই জড়িয়ে আছে সোনালী অতীত। আমাদের এই বাংলায় উৎপাদিত ঢাকাই মসলিন একসময় সারা বিশ্বে রপ্তানি হত। মসলিন অতি মিহি ও সূক্ষ্ম কাপড়। ৪০ হাত লম্বা ২ হাত চওড়া কাপড় অনায়াসেই একটা আংটির মধ্যে দিয়ে গলিয়ে নেয়া যেত। কথিত আছে, বণিকরা ঝিনুকের খোলের ভেতর শত শত গজ মসলিন কাপড় আনা নেওয়া করতেন। ১৭৫ গজ লম্বা কাপড় একত্র করলে হত একটা কবুতরের ডিমের মত!বহু কালে বহু কবি সাহিত্যিকগন এই ঐতিহ্যবাহী মুসলিন নিয়ে কবিতা লিখেছেন l
চরকায় সম্পদ, চরকায় অন্ন,
বাংলার চরকায় ঝলকায় স্বর্ণ!
বাংলার মসলিন বোগদাদ রোম চীন
কাঞ্চন-তৌলেই কিনতেন একদিন।
চরকার ঘর্ঘর শ্রেষ্ঠীর ঘর-ঘর।
ঘর-ঘর সম্পদ, -আপনায় নির্ভর!
সুপ্তের রাজ্যে দৈবের সাড়া,
দাঁড়া আপনার পায়ে দাঁড়া!

                                                      -সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

ইরাকের টাইগ্রিস নদীর তীরে মসূল নামে এক স্থানে এরকম সূক্ষ্ম কাপড় তৈরি হতো। সেজন্য এই ‘মসূল’ শব্দটি থেকে আমাদের ভূমিতে তৈরি এই মিহি কাপড়টির নাম হয়ে যায় মসলিন।মসলিনের প্রাচীন নাম গঙ্গাপট্টাহি।
বহু দিক বিবেচনা করে মসলিন পুনরুজ্জীবিত নিয়ে অনেক দিন ধরে কাজ করছেন সাইফুল ইসলাম।তিনি বলেন, বর্তমানে বেশির ভাগ সংস্করণে কাউন্টের সংখ্যা ৪০-৮০-এর মধ্যে। অন্যদিকে ঢাকাই মসলিনের কাউন্ট ছিল ৮০০-১২০০-এর মধ্যে যা এখন বিলুপ্ত l

বিলুপ্তি হওয়া সেই ঐতিহ্যবাহী মসলিন প্রায় ১৭০ বছর পর আবার বাংলাদেশে বোনা হলো l বাংলাদেশের একদল গবেষক, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে দীর্ঘ ছয় বছর গবেষণা করে সক্ষম হয়েছেন ঢাকাই মসলিন তৈরিতে। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা ছয়টি মসলিন শাড়ি তৈরি করেছেন। এই কাপড়গুলো ঠিক সেরকমই, আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে পার করে দেওয়া গেছে আস্ত একটি শাড়ি! ঢাকাই মসলিন তৈরিতে বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ১৮জন গবেষক কাজ করেছেন। গবেষণার প্রথম ধাপে মসলিনের ছয়টি শাড়ি তৈরি করা হয়েছে। একেকটি শাড়ি তৈরিতে খরচ হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

তিন সদস্যের একটি দল যায় যুক্তরাজ্যের ভিক্টোরিয়া এন্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে মসলিনের নমুনা সংগ্রহ করতে। সেখানে তারা মসলিনের ডিএনএ বের করে তার সিকোয়েন্স করে। পরে তারা বেরিয়ে পরে কার্পাস তুলার সন্দানে l এর জন্য বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় । তারা নয়টি জেলা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে এবং এর মধ্যে কাপাসিয়ার একটি কার্পাস তুলোর সঙ্গে মসলিনের ডিএনএর মিল পায়। পরে গুটি কার্পাস তুলার ওই জাত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা মাঠে লাগান হয়।তাদের মতে তুলো সংগ্রহ ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাঙালীর অতীত ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের স্মারক হিসেবে মসলিন কাপড় উৎপাদন ও প্রচলনের প্রয়োজনীয়তা অত্যাবশ্যক বলে ধরে নেয়া যায়। এছাড়া ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই মহৎ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে মসলিন কাপড় পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা এখন কেবলই সময়ের দাবি l

Writer Information:

Sanzida Sharmin
1st year 2nd semester
(Batch-41)
Department of Textile Engineering
Ahsanullah University Of Science And Technology.

Sangida Masum Lima
1st year 2nd semester
(Batch-41)
Department of Textile Engineering
Ahsanullah University Of Science And Technology.

Sayef Ahmed
2nd year 1st semester
(Batch-40)
Department of Textile Engineering
Ahsanullah University Of Science And Technology

Source :

  1. Google
  2. bbc.com
    3.boishakhionline.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here