নারীদের লুকানো গল্প সুইঁ সুতাতে

0
676

নকশি কাঁথা নকশা করা কাঁথা, বাংলার অন্যতম লোকশিল্প। বাংলাদেশে এ পারিভাষিক শব্দটির বহুল ব্যবহার শুরু হয় জসীমউদ্দীনের নক্সী কাঁথার মাঠ (১৯২৯) কাব্য থেকে। পশ্চিমবঙ্গে নকশা করা হোক বা না-হোক সকল কাঁথাই ‘কাঁথা’ নামে পরিচিত ছিল। ইদানীং অবশ্য ‘নকশি কাঁথা’ শব্দের প্রচলন হয়েছে। কাঁথাকে খেতা, কেন্থা ইত্যাদি নামেও অভিহিত করা হয়।

নকশি-কাঁথাটি বিছাইয়া সাজু সারারাত আঁকে ছবি

ও যেন তাহার গোপন ব্যথার বিরহিয়া এক কবি।”

নকশি কাঁথার মাঠ—জসীমউদ্দীন

কবি জসীমউদ্দীন এক অদ্ভুত মায়াময় আখ্যান রচনা করেছিলেন তাঁর পাঠকদের জন্য। সাজু আর রূপাইয়ের বিচ্ছেদি প্রেমের গল্প হলেও সে কাহিনির প্রধান চরিত্র ছিল নকশা তোলা নকশিকাঁথা। কাঁথা বুনতে বুনতে কত কথাই না সাজুর মনে হয়েছে, মনে পড়েছে কত স্মৃতি। লাল-নীল সুতায় সেসব কথাই কাঁথার জমিনে ফুটে উঠেছিল প্রেম আর বিরহ–বেদনার গল্প হয়ে।।

যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নারীরা সেলাই করে চলেছেন এ কাঁথা উষ্ণতা ও উপহারের জন্য। তবে যশোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চল কাঁথার নকশা, সেলাইয়ের ফোঁড়ের কলাকৌশলের জন্য একেবারে স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করে নিয়েছে নকশিকাঁথার ভুবনে।

নকশিকাঁথা তৈরির উপকরণঃ
গ্রামাঞ্চলের নারীরা পাতলা কাপড়, প্রধানত পুরানো কাপড় স্তরে স্তরে সজ্জিত করে সেলাই করে কাঁথা তৈরি করে থাকেন। কাঁথা মিতব্যয়ীতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, এখানে একাধিক পুরানো জিনিস একত্রিত করে নতুন একটি প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করা হয়। কাঁথা তৈরির কাজে পুরানো শাড়ি, লুঙ্গি, ধুতি ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁথার পুরুত্ব কম বা বেশি হয়। পুরুত্ব অনুসারে তিন থেকে সাতটি শাড়ি স্তরে স্তরে সাজিয়ে নিয়ে স্তরগুলোকে সেলাইয়ের মাধ্যমে জুড়ে দিয়ে কাঁথা তৈরি করা হয়। সাধারণ বা কাঁথাফোঁড়ে তরঙ্গ আকারে সেলাই দিয়ে শাড়ীর স্তরগুলোকে জুড়ে দেয়া হয়। বিভিন্ন রঙের পুরানো কাপড় স্তরীভূত করা থাকে বলে কাঁথাগুলো দেখতে বাহারী রঙের হয়। সাধারণত শাড়ীর রঙ্গীন পাড় থেকে তোলা সুতা দিয়ে কাঁথা সেলাই করা হয়।

নকশার প্রক্রিয়াঃ
মূলত নকশা করার পূর্বে কোন কিছু দিয়ে এঁকে নেওয়া হয়। তারপর সুঁই-সুতা দিয়ে ওই আঁকা বরাবর সেলাই করা হয়। কাঁথায় সাধারণত মধ্যের অংশের নকশা আগে করা হয় এবং ধীরে ধীরে চারপাশের নকশা করা হয়। আগে কিছু কাঁথার নকশা আঁকানোর জন্য কাঠের ব্লক ব্যবহার করা হত, এখন ট্রেসিং পেপার ব্যবহার করা হয়।

বর্তমানে উপমহাদেশের অবিচ্ছেদ্য কয়েকটি নকশাঃ

পর্বত নকশা
মৎস নকশা
নৌকা নকশা
পায়ের ছাপ নকশা
রথ নকশা
মসজিদ নকশা
পাঞ্জা নকশা
কৃষি সামগ্রী
প্রানী-নকশা
সাজঘর সামগ্রী
রান্নাঘর সামগ্রী
পালকি নকশা।


ময়মনসিংহ অঞ্চলে নকশিকাঁথাকে বলা হয় ‘ফুলের কাঁথা’।
ফুলের কাঁথার মূল নকশা বিভিন্ন ধরনের ফুল, বিভিন্ন আকার ও রঙের ফুল। সাধারণত সাদা জমিনে রঙিন সুতায় বোনা হয় এসব ফুল। জ্যামিতিক নকশার খুব একটা উপস্থাপনা নেই এসব কাঁথায়।।।

নকশিকাঁথার ব্যবহারঃ
বাঙ্গালির জীবনে নকশিকাঁথার ব্যবহার শুধু উৎসবে আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়।নিত্য প্রয়োজনীয় আরও অনেক কিছুর সাথেই জড়িয়ে আছে এই নকশিকাঁথা।কাঁথা সাধারণত লেপের মতো মুড়ি দিয়ে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধরনের কাঁথা গুলো হলো : ‘লেপ-কাঁথা’ আকারে বড় ও মোটা হয়। এক বর্গফুট আকারের রুমালে তৈরি নকশী কাঁথাই ‘রুমাল কাঁথা’। ‘আসন নকশী কাঁথা’ বসার আসন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ভারী ও মূল্যবান জিনিসপত্র এবং কাপড় চোপড় ঢেকে রাখাতে ‘বস্তানি বা গাত্রি’ ধরনের নকশী কাঁথা ব্যবহার করা হয়। আরশির অর্থ আয়না। আর এই আয়না- চিরুনি ইত্যাদি ঢেকে রাখার জন্য যে নকশী কাঁথা ব্যবহার হয় তা ‘আরশিলতা’ নামে পরিচিত। খাবারের সময় ‘দস্তর খানা’ নামক নকশী কাঁথা মেঝেতে পেতে তার উপরে খাবার দাবার ও বাসনপত্র রাখা হয়। খাম আকারের যে কাঁথার মধ্যে কোরআন শরীফ রাখা হয় তাকে বলা হয় ‘গিলাফ’।।।
এই সময়ে এসে পোশাকের পাশাপাশি বিছানার চাদর, দেয়ালের ছবি, বালিশের কভার, কুশন কভার, মানিব্যাগ, মুঠোফোনের ব্যাগ, বটুয়া ইত্যাদি জিনিসে নকশিকাঁথার ফোঁড় তুলে ধরা হচ্ছে।।।

লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণে নকশিকাঁথাঃ

নকশী কাঁথা নিয়ে এ পর্যন্ত প্রচুর গবেষণা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে বাংলার নকশী কাঁথা। লন্ডনের ন্যাশনাল মিউজিয়াম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, সোনারগাঁও কারুশিল্প জাদুঘর, কলকাতার গুরু সদরদত্ত মিউজিয়াম, আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়ামেও আমাদের নকশী কাঁথা রয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পাচ্ছে নকশী কাঁথাঃ

পাট ও বস্ত্র সচিব মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ‘দেশের নকশী শিল্পী ও শিল্প পুনর্বাসনে জামালপুরে ৩০০ একর জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে ‘শেখ হাসিনা নকশী পল্লী’ প্রকল্প। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদন পেয়েছে প্রকল্পটি। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭২২ কোটি টাকা’।।।

তথ্য ও ছবিঃ উইকিপিডিয়া, বিডিনিউজ।

Writer Information:

Fouzia Jahan Mita

NITER 10th Batch.
Department of Textile Engineering.
Campus Ambassador, TES.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here