Home Life Style & Fashion নারীর সৌন্দর্যে কাতান

নারীর সৌন্দর্যে কাতান

শাড়ি ১২ হাতের এক ক্যানভাস। এই ১২ হাতে ফুটে ওঠে কত নকশা, কত কারুকাজ। শাড়ি বাংলাদেশী নারীদের জাতীয় পোশাক। নৈমিত্তিক এবং আনুষ্ঠানিকতায় শাড়ি বাংলাদেশের নারীদের সবচেয়ে জনপ্রিয় পোশাক। শাড়ি ভালোবাসেনা এমন বাঙালি মেয়ে পাওয়া যাবে না নিশ্চিত। কত রকমের কত নামের না শাড়ি আছে। কত রকম সুতা ব্যবহিত হয় তার বুননে। শাড়ি ছাড়া নারী যেন এক অসম্পূর্ণ সৌন্দর্য। মসলিন, টঙ্গাইল,বেনারসি, কাতান ও জামদানী এরকম নানান শাড়ি শোভা পাচ্ছে নারীর সৌন্দর্যে।কাতান শাড়ির সমারোহ অন্য রকম মাধুর্য নিয়ে আসে। আর একটি লাল টুকটুকে কাতান শাড়ি-ই কনেকে সবার থেকে আলাদা রাখে।

ইতিহাসঃ

শাড় শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শাটি হতে যার অর্থ এক ফালি কাপড়। পরবর্তীতে এটি প্রাকৃত এর বিবর্তনের কারনে শাডি বা সাত্তিকা শব্দ হতে শাড়ি শব্দে পরিনত হয়।সম্ভবত ইতিহাসের প্রাচীনতম পরিধেয় বস্ত্র হলো শাড়ি যার জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। কখন কিভাবে শাড়ির উৎপত্তি হয়েছিল সেই ইতিহাস খুব একটা স্পষ্ট নয়।এর ধারণা সেলাই বিহীন বস্ত্র খন্ড থেকে। শাড়ির উৎস খ্রীস্টপূর্ব ২৮০০ থেকে খ্রীস্টাব্দ ১৮০০ এর দিকে যা সিন্ধু সভ্যতার সময় চিন্হিত করে। কাতান শাড়ি মুলত তৈরি হয় রেশমি ও সিল্ক সুতা দিয়ে। খ্রীস্টপূর্ব ২৪৫০ থেকে খ্রীস্টাব্দ ২০০০ এর দিকে সিল্ক ও রেশম চাষ হওয়ায় তখন থেকে রেশম কাপড়র প্রচলন হয়।কাতান শাড়ির প্রচলন হয় ১৯৪৭ সালের দিকে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারতের বেনারস থেকে মুসলমান তাঁতিরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অর্থাৎ বর্তমানের বাংলাদেশে চলে আসে। বাংলাদেশের তাঁতিরা তাদের নিজস্ব সৃজনশীলতা, নান্দনিক ডিজাইনের মাধ্যমে উন্নত রুচির পরিচয় দিচ্ছে বহু বছর ধরে।

কাতান শাড়িঃ

শাড়ির ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে কাতান।সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে কাতানের নকশা বুনন আর রঙে এসেছে নানা পরিবর্তন। যুগে যুগে বদলেছে শাড়ির পাড়,আচল ও বুনন কৌশল। বাংলাদেশের তাঁতিরা বছরের পর বছর কাতান শাড়ি বুনছে আপন সৃজনশীলতা দিয়ে। বেনারসি শাড়ির আরেকটি ধরন হলো কাতান শাড়ি।
দেশ বরেণ্য ফ্যাশন ডিজাইনার এমদাদ হকের ভাষ্যমতে জ্যাকার্ড হ্যান্ডলুমে টানা ভরনায় দেওয়া আছে রেশম সুতো আর তাঁতির বুননের সাথে সাথে জমিনে ভেসে উঠেছে বেনারসি মোটিফের লতা,ফুল, কলকা ইত্যাদি। এরই নাম কাতান শাড়ি। বিয়েতে উজ্জ্বল বাহারি রঙ আর কারুকাজের শাড়ির সমারোহ অন্যরকম মাধুর্য নিয়ে আসে। হালকা কাজে বা এক কালারের সাথে গাঢ় পাড়ের কাতান শাড়ি ব্যবহার করে থাকেন নারীরা। সাধারণত উৎসবে কাতান শাড়ি বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আনন্দঘন মুহুর্তকে আরও আনন্দিত করতে কাতান শাড়ির জুড়ি মেলা ভার।বিয়ে এবং বৌভাত অনুষ্ঠানে বিয়ের কনেকে কারুকার্য মন্ডিত উজ্জ্বল রঙের বেনারসি, কাতান শাড়ি পড়িয়ে সাজানো হয়।আধুনিকতার সাথে সাথে কাতান শাড়ির চাহিদা বেড়েই চলেছে।

কাতান শাড়ির বৈশিষ্ট্যঃ

কাতান শাড়ি ঐতিহ্য ও আভিজাত্য বাঙালি বধুর সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে বহুগুণে। কাতান শাড়ি আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। মেয়েরা বেড়াতে গেলেই কাতান শাড়ি পড়ার কথা ভাবে অনুষ্ঠানে গেলেও প্রথম পছন্দের তালিকায় কাতান শাড়িকে রাখে।কারন এ শাড়ি সহজে সামলানো যায়। এর ওজন হাল্কা তাছাড়া এই শাড়ি দেখতে খুব সুন্দর। শাড়িতে থাকে নানা কারুকাজ। উজ্জ্বল রঙের যেকোনো শাড়ি যেকোনো বয়সের নারীকে মানিয়ে যায়।এক কালারের কাতান হলেও আঁচল আর পাড়ে বিভিন্ন নকশা করা থাকে। কাতান শাড়ির অন্যতম আকর্ষণ হলো এর উজ্জ্বলতা! যেটি খুব গর্জিয়াস লুক দেয়! নেট কাতান শাড়ি গুলো প্রায় সব নারীদের ব্যবহার করতে দেখা যায়। যদিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শাড়ি বলতে আধুনিক ঘরানার শাড়িকেই জনপ্রিয় করা হয়েছে তবে উপমহাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই নিজস্ব ধরনের শাড়ির তৈরি ও জনপ্রিয় হয়েছে।

কাতান শাড়ির প্রকারভেদঃ

মানুষের মন রন্জন করার জন্য তৈরি হয় নানা ধরনের শাড়ি। কাতান শাড়ির ও অনেক প্রকারভেদ আছে যার প্রত্যেকটি ডিজাইন ও বৈশিষ্ট্য অপরটির থেকে আলাদা। যেমন,
.সিল্ক কাতান শাড়ি
.বেনারসি কাতান শাড়ি
.সাউথ কাতান সারই
.নেট কাতান শাড়ি
.অপেরা কাতান শাড়ি
.মিরপুর কাতান শাড়ি
.কটন কাতান শাড়ি
.বুটিক কাতান শাড়ি
.বাটিক কাতান শাড়ি
.দক্ষিনী কাতান শাড়ি
.ইন্ডিয়ান কাতান শাড়ি
এসব কাতানের প্রত্যকটির আবার রঙ ও বাহারের ভিন্নতার পাশাপাশি অনেক ধরন আছে। এগুলো মানুষের রুচি ও অভ্যাসের ভিত্তিতে দেয় বাহারি ডিজাইন ও কোয়ালিটি। এসব শাড়ির কিছু সেরা ব্রান্ড রয়েছে।

সেরা ব্রান্ড সমূহঃ
.লেডিস ফ্যাশন কাতান শাড়ি
.রাজটেক্স কাতান শাড়ি
.নবসাজ কাতান শাড়ি
.রাজগুরু কাতান শাড়ি

বেনারসি ও কাতানঃ

বেনারসি ও কাতান একে অপরের সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত। বিয়ের শাড়ি হিসেবে বেনারসি বা কাতান না হলে যেন চলেই না।অত্যন্ত জনপ্রিয় এই শাড়ি বোনা হয় রেশমি সুতো দিয়ে। এর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় কাচা- রেশম সুতো। এক রঙ ব্যবহার করে পুরো শাড়িতে নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়।সোনালি, রুপালি সুতো এই নকশা ফুটিয়ে তোলার জন্য ব্যবহার করা হয়।
বেনারসির অন্য নাম কাতান। তবে বেনারসি শাড়ির ধরন বা ডিজাইনের উপর ভিত্তি করে রাখা হয় শাড়ির নাম। যেমন, পিরামিড কাতান, ব্রোকেট কাতান,বেনারসি কসমস, চুনরি কাতান, প্রিন্স কাতান ও মিরপুরী রেশমি কাতান ইত্যাদি। এই শাড়ির মুল উৎপত্তি স্থল ভারতের বেনারস শহর। এই শাড়ি মানব চালিত একটি যন্ত্রের সাহায্যে তৈরি করা হয়। যাকে বলে তাত আর কারিগররা হলো তাঁতি। কাতান বা বেনারসি খুবই সুন্দর শাড়ি। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান গুলো কাতান শাড়ি ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ। এই শাড়ি বাঙালির আভিজাত্য ও গাম্ভীর্য তুলে ধরে।

কাতান শাড়ির জনপ্রিয়তাঃ

সেই সুদূর সুলতানি অথবা মুঘল আমল থেকেই বাঙালি মেয়েদের কাতান শাড়ি পরিধান করার রীতি উল্লেখযোগ্য হারে চোখে পড়ে। আর কাতান শাড়ি ছাড়া এদেশের বড় ধর্মীয় উৎসব কিংবা বিয়ের মতো অনুষ্ঠান সমূহ যেন জমেই না।আর একটি লাল টুকটুকে কাতান শাড়ি-ই কনেকে সবার থেকে আলাদা করে রাখে।কাতান ছাপিয়ে মাঝের সময়টুকুতে বিদেশি শাড়িগুলোর চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। আাবার দেশীয় শাড়ির জনপ্রিয়তা ফিরে এসেছে।

দেশীয় শাড়ির ঐতিহ্য ও আভিজাত্য বাঙালি বধুর সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে বহুগুণে। আামাদের দেশে কাতান শাড়ি মূলত বিয়ের শাড়ি হিসাবেই সর্বাধিক পরিচিত ও জনপ্রিয়। বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় কাতান শাড়ি হলো নান্দনিক নকশা, বৈচিত্র্যময় রঙ ও সুন্দর বুননের সিল্ক কাতান শাড়ি, কাতান বেনারসি, সাউথ কাতান সারই,নেট কাতান শাড়ি ও অপেরা কাতান শাড়ির জনপ্রিয়তা বেশি। বিশেষ গুণসম্পন্ন হওয়ায় অনলাইন মার্কেটে কাতান শাড়ি খুব চলে।বাংলাদেশে সর্বাধিক বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কাতান শাড়ির জনপ্রিয়তা শীর্ষে।

তথ্যসুত্রঃ

তুলট, কালের কন্ঠ, Facebook, www,daraz,com.bd

Writer information :

Mst Afsana Akter Urme

Dr. M A Wazed Miah Textile Engineering College (DWMTEC)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author