Home Business Factory Review বাংলাদেশের ফ্যাশন ব্র্যান্ড পরিচয়- (পর্ব-০২)

বাংলাদেশের ফ্যাশন ব্র্যান্ড পরিচয়- (পর্ব-০২)

সচরাচর যারা ব্র্যান্ডের পোশাক পরে থাকেন তাদের কাছে আড়ং নামটা পরিচিত। দেশের ফ্যাশন খাতে আড়ং গত চার দশক ধরে ব্যবসা করে আসছে। তাদের পেছনের গল্পটা তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

দেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে চার দশক আগে যাত্রা শুরু করে আড়ং। ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও আধুনিক ব্যবসা-কৌশলের সঙ্গে মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের দর্শন আড়ংকে পরিণত করেছে একটি অনন্য ব্র্যান্ডে, যেটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান।

শুরুতে সিল্ক উৎপাদন ও নকশিকাঁথা কাজ এর মাধ্যমে গ্রাম অঞ্চলের মহিলাদের কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে আড়ং সূচনা করে। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে আড়ং গ্রাম অঞ্চলের দক্ষ লোকেদের হস্তশিল্প এর কাজেও তাদের ব্যবসার সম্প্রসারন করে।

অন্যদিকে ব্র্যাক লক্ষ্য করে যে বাংলাদেশের মহিলারা কৃষি কাজের সাথে বেশি জড়িত। সেখানে আবার এক প্রকার বৈষম্য ছিল যে পরিবারের পুরুষরা মূলত শস্য বাজারে বিক্রি করত আর লভ্যংস নিজেরা লাভ করত অথচ মহিলারা যেখানে পুরো কৃষি কাজের ৭৫% নিজরাই করত। এসব মহিলাদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা তৈরি করতেই ১৯৭৮ সালে তৎকালীন সহযোগী ডাইরেক্টর আয়েশা আবেদ এর নেতৃত্বে ব্র্যাক সেরিকালচার প্রজেক্ট উদ্ভাবন করে।

এই সেরিকালচার প্রজেক্ট মানিকগঞ্জ জেলার মহিলাদের সহযোগিতা করত উন্নত গুনাগুণ সম্পন্ন সিল্ক উৎপাদন করতে পাশাপাশি জামালপুর জেলার গ্রাম্য মহিলাদের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা তৈরি করতে। কিন্তু অচিরেই একটা সমস্যা দেখা গেল যে, মহিলাদের তৈরি এসব সিল্ক এবং নকশিকাঁথা বিক্রি করার মত যথেষ্ট লোক বা প্লাটফর্ম কোনোটাই নেই। তাই ব্র্যাক তাদের উদ্যোগ টি আরও সামনে সম্প্রসারন করতে একটি প্লাটফর্ম তৈরি করার কথা ভাবে যেখানে এসব মহিলারা তাদের পণ্যগুলো শহরে বিক্রি করতে পারবে। সেখান থেকেই আড়ং এর পথ চলা শুরু। যেখানে গ্রাম্য দরিদ্র এবং শহুরে খুচরা বিক্রেতাদের মাঝে একটা সেতুবন্ধন তৈরি হয়।

আড়ং এর সূচনার পর থেকেই এটি ব্র্যাকের বিভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও নারী ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির জন্য তাদের নানা কর্মসূচি চলমান রয়েছে। আড়ং এর পন্য বিক্রির প্রক্রিয়াটি বিভিন্ন ধাপে হয় থাকে। প্রথমে একটি ডিজাইনার দল মৌসুমের প্রচলন অনুযায়ী কিছু ডিজাইন তৈরি করে যা পরবর্তী ধাপে উৎপাদন এর জন্য গ্রাম্য কারিগর দের হাতে চলে যায়। এক্ষেত্রে মানসম্মত ডিজাইন বজায় রাখতে আড়ং তাদের কারিগর দের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রতিনিয়ত ট্রেনিং করে থাকে। আবার পরবর্তীতে উৎপাদিত পণ্যের গুণাগুণ যাছাই করে তাদের শহরের বিভিন্ন আউটলেট এ বিক্রির জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

আড়ং এর বর্তমানে ক্রেতারা মূলত প্রাথমিকভাবে মধ্যম আয়ের ও উচ্চ মধ্যম আয়ের লোকদের একাংশ। বর্তমানে আড়ং এর ১৫টি আউটলেট বাংলাদেশ এর বিভিন্ন জায়গায় চালু রয়েছে। তন্মধ্যে ঢাকায় ৯টি, চট্টগ্রামে ২টি এবং সিলেটে, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ও কুমিল্লায় ১টি করে আউটলেট রয়েছে। তাদের আউটলেট গুলোতে বর্তমানে বিদেশি ক্রেতাদের ও প্রচুর জনপ্রিয়তা রয়েছে। আড়ং ২০০১ সালে লন্ডনে একটি ফ্র্যানঞ্চাইজড আউটলেট চালু করে শুধু তাই নয় তারা তাদের ই-কমার্স ওয়েবসাইট টিকে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাজারে নিয়ে যাওয়ার ও পরিকল্পনা করছে।

সুতি তাঁত শিল্পের সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করণে এর উল্লেখযোগ্য অবদানের পাশাপাশি আড়ং স্থানীয়ভাবে তৈরি কাপড়ের বৃহত্তর চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে, যার ফলস্বরূপ প্রায় বিলুপ্তপ্রায় সনাতনী জামদানি (বোনা সুতির ফ্যাব্রিক) পুনরুদ্ধার , মসলিন (আলগা বোনা কাপড়) এবং নকশিকাঁথা ফিরিয়ে আনতেও আড়ং প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে ।

ব্র্যাকের উন্নয়ন কর্মসূচীগুলিতে তার মুনাফার ৫০ শতাংশ পুনরায় বিতরণ করা ছাড়াও বাকী ৫০ শতাংশ নিজস্ব ক্রিয়াকলাপ বজায় রাখার জন্য ব্যবহার করে। এছাড়াও আড়ংয়ের নিজস্ব কাঁচামাল ব্যবহার করে বাংলাদেশের অসংখ্য কারিগর সম্প্রদায়কে বজায় রাখে। আড়ং বাংলাদেশের মূল তুলা উৎপাদনের ক্ষেত্র মাধবদীতে উৎপাদিত তুলার ৭৫ শতাংশ তুলা এবং মালদহায় উৎপাদিত সিল্কের ৭০শতাংশের বেশি কিনে ফেলে।

সবকিছুর উর্ধ্বে মূলত আড়ং দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামীণ নারীদের সমর্থন করার লক্ষ্যে শুরু করেছিল যাতে তারা তাদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এবং নিজেদের কর্মীদের কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে নিজেদের ক্ষমতায়িত করতে পারে। এই লক্ষ্যটি আজও অবধি একই রয়ে গেছে, এবং এর পরিধি আরও গ্রামীণ দরিদ্র ও শহুরে বাজারগুলিতে প্রসারিত করার লক্ষ্যে আড়ং আজও কাজ করে যাচ্ছে।

Sazib Bhowmick
National institute of textile engineering and research (NITER),
9th batch
Email- [email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author