মাইক্রো ফাইবারের বিশদ আলোচনা

0
1267

“ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালি-কণা, বিন্দু বিন্দু জল গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল” জিহ কিছুটা অবাক হচ্ছেন তাই নাহ?? তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে এই লাইনটি যেন অনেকাংশেই “মাইক্রোফাইবার”কেই প্রতিনিধিত্ব করে,  কিভাবে করে??  তা জানার জন্য পুরো আর্টিকেল টি পরার অনুরোধ রইলো।

✍মাইক্রোফাইবারঃ

মাইক্রোফাইবার হলো মনুষ্য তৈরি একটি সিন্থেটিক উপাদান, যা ওজনে ১ ডেনিয়ার এর চাইতেও কম সহজ ভাষায় বলা হলে ৯০০ মিটার দৈঘ্যের মাইক্রো সুতার ওজন মাত্র ১ গ্রাম এবং মাইক্রোফাইবারের ব্যাস মানুষের চুলের ব্যাসের এক পঞ্চমাংশ।
বর্তমানে চারটি প্রকরণের মাইক্রোফাইবার বানিজ্যিক ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।

✍ গাঠনিক উপাদান

মাইক্রোফাইবারের গাঠনিক উপাদান মূলত দুটি,  পলিয়েস্টার এবং পলিমাইড।
পলিয়েস্টার মাইক্রোফাইবার এর দেহ-কাঠামো গঠন করে এবং পলিমাইড তার শোষণ এবং ঘনত্ব কে ধার দেয়।

✍ইতিহাস

অতি সূক্ষ্ম তন্তুগুলির উৎপাদন শুরু হয়েছিল ১৯৫০ এর শেষের দিকে মেল্ট ব্লাউন স্পিনিং এবং ফ্ল্যাশ স্পিনিং কৌশল ব্যবহার করে।
১৯৬০ সালে জাপানের টরে ইন্ডাস্ট্রিতে বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের মধ্যে অন্যতম একটি আবিষ্কার ছিলো “আল্ট্রাসিউডি”,বলে রাখা ভালো আল্ট্রাসিউডি প্রথম সফল সিন্থেটিক ফাইবার গুলোর মধ্যে অন্যতম যা ১৯৭০ সালে বাজারে আসে এবং তখন থেকেই টেক্সটাইল শিল্পে মাইক্রোফাইবারের ব্যবহার প্রসারিত হয়েছিল।

✍মাইক্রোফাইবারের বিশেষত্ব

✒কোমলতাঃ

জেনে অবাক হবেন মাইক্রোফাইবার মোডাল সিল্ক থেকে ২ গুণ, তুলা থেকে ৩ গুণ, উল থেকে ৮ গুণ এবং মানুষের চুলের তুলনায় ১০০ গুণ পাতলা।

✒পরিষ্কারক হিসেবে মাইক্রোফাইবারঃ

মাইক্রোফাইবার একটি সিন্থেটিক উপাদান এবং সিন্থেটিক গঠনের কারণে মাইক্রোফাইবার বৈদ্যুতিক চার্জ বিকাশ করে যা ধুলা-ধ্বংসাবশেষ আকর্ষন করে এবং পরিষ্কার করার কাজটি আরো সহজ করে তুলে এবং জেনে আরো অবাক হবেন যে মাইক্রোফাইবারের তৈরি একটি কাপড় নিজ ওজনের তুলনায় সাত গুণ ওজনের পানি শোষণ করতে সক্ষম।

✒মাইক্রোস্কোপে মাইক্রোফাইবারঃ

মাইক্রোস্কোপের নিচে মাইক্রোফাইবার দেখা হলে এর ক্রস-বিভাগটি দেখতে অনেকটা তারা বা নক্ষত্রের মতো দেখায়, জেনে অবাক হবেন এই তারার মতো আকৃতি মাইক্রোফাইবারকে এর ভেতর ধুলোবালি-ধ্বংসাবশেষকে আটকে দিতে সাহায্য করে এবং এটি আমরা যে পৃষ্ঠের উপর কাজ করছি তাকে ধুলোবালি থেকে দুরে রাখতে সাহায্য করে।

✍মাইক্রোফেব্রিকঃ

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা দিয়ে যেমন মহাদেশ গড়ে ওঠে,বিন্দু বিন্দু জলের সমষ্টি যেমন সৃষ্টি করে মহাসমুদ্র তেমনি মাইক্রোফাইবারের সমষ্টি তৈরি করে মাইক্রোফেব্রিক যা পোশাক থেকে শুরু করে পরিষ্কারের পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

✍তুলা নাকি মাইক্রোফাইবার?

তুলা একটি প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি উপাদান তবে তুলার বিপরীতে মাইক্রোফাইবার কিন্তু প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি উপাদান নয়।
শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজে তুলো বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করে তবে তুলোর শীটের চাইতে মনুষ্যউৎপাদিত মাইক্রোফাইবারের শীট বেশি টেকসই হয়ে থাকে।

✒পরিষ্কারের কাজে তুলো নাকি মাইক্রোফাইবারঃ

কাঠামোগত কারণেই মাইক্রোফাইবার তুলোর চাইতে পরিষ্কারের কাজে বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।
মাইক্রোফাইবারের সিন্থেটিক গঠনের কারনে বৈদ্যুতিক চার্জ বিকাশ করে যা সহজেই ধুলিক্ণা আকর্ষন করে পরিষ্কারের কাজটি সহজ করে তোলে সেখানে তুলো নিরপেক্ষ চার্জ বিশিষ্ট হওয়ার কারনে ধুলিকণা সহজে আকর্ষন করে না ফলে পরিষ্কার এর কাজে তেমন সহায়ক ভূমিকা পালন করে নাহ। 
মাইক্রোফাইবার পৃষ্ঠের ব্যাকটেরিয়া গুলির ৯৯.৯% অপসারণ করতে সক্ষম যেখানে তুলো কেবল দূষিত পদার্থকে ঘিরে কাজ করে ফলে বেশির ভাগ ব্যাকটেরিয়াই অপসারণ সম্ভব হয়ে উঠে নাহ।

✍মাইক্রোফাইবার দ্বারা সৃষ্ট পরিবেশগত সমস্যা

যদিও মাইক্রোফাইবার পরিবেশগত ভাবে নিরাপদ এবং উন্নত সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য নিশ্চিত করলেও এই পণ্যটি মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো সমুদ্রের খাদ্য চেইনে প্রবেশের বিষয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ রয়েছে, এক গবেষণায় দেখা গেছে মাইক্রোফাইবারের তৈরি সিন্থেটিক জ্যাকেট ধুয়ে ফেলা হলে ১.৭ গ্রাম মাইক্রোফাইবার বের হয় যা পরে ৪০% নদী, হ্রদ, মহাসাগরে প্রবেশ করে এবং সামগ্রিক প্লাস্টিক দূষণে ভূমিকা রাখে তবে জেনে রাখা ভালো সিন্থেটিক ফাইবার উৎপাদনের জন্যে কীটনাশক ব্যবহার করা হয় নাহ।

✍মাইক্রোফাইবার এর প্রয়োজনীয়তা

বছরের পর বছর ধরে মাইক্রোফাইবার গুলো পোশাক,ম্যাট নিটস,গৃহসজ্জার সামগ্রী, তোয়ালে এবং আনুষাঙ্গিক পরিষ্কারের পণ্য গুলিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই তন্তু গুলী সুতা তৈরি করতে এক সাথে বোনা হয় এবং পরে এমন একটি  কাপড় তৈরি করতে সক্ষম হয় যা ক্ষুদ্রতম ধুলো এবং ময়লা তুলতে সক্ষম।  কাপড় যতো ঘন হয় অর্থাৎ তাঁত পক্রিয়া চলাকালীন যতো বেশি সুতা ব্যবহার হবে এটি পরিষ্কারো ততো ভালো ভাবে করবে।
মাইক্রোফাইবারের বর্ধিত শোষণ, কোমলতা, বলিষ্টতা এবং বেশির-ভাগ নিয়মিত সুতির কাপড়ের চেয়ে বেশি ময়লা ধূলিকণা আটকে রাখার ক্ষমতা মাইক্রোফাইবারকে অনন্য এবং বিশেষ করে তোলে।

✍লেখক পরিচিতি:

আরাফাত খান প্রীতম
ক্যাম্পাস এম্বাসেডর
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারস সোসাইটি।email: [email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here