সকল ফাইবার এর রাজ্যে “তুলা” এর রাজত্ব

0
1237

তুলা বা Cotton একধরনের আশঁজাতীয় নরম পদার্থ বিশেষ যা তুলা গাছের বীজের সাথে সম্পৃক্ত থাকে।গাছ থেকে তুলাকে একত্রে সংগ্রহ করে তা সুতা তৈরি,বালিশ তৈরি এবং চিকিৎসাক্ষেত্র সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।তুলা থেকে সুতা তৈরি করে সেই সুতা দিয়ে কাপড় উৎপাদন করা হয় এবং পরবর্তী তা পোশাক তৈরি সহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়।প্রচন্ড গরমে তুলার থেকে উৎপাদিত কাপড় বা সুতি কাপড় ব্যবহার করলে খুব আরাম অনুভূত হয়।সংগ্রহকৃত তুলা থেকে সুতা প্রস্তুত করলে তা তেমন টেকসই হয় না তবে কয়েকটি সুতা একত্রিত করলে তা খুবই শক্ত এবং মজবুত আকৃতি ধারন করে।সঠিক বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করার জন্য উৎপাদিত সুতায় ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ধরনের রঙ।

তুলার ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে কটন(Cotton) যা উদ্ভুত হয়েছে আরবি নাম আল কুতন্ থেকে।বিভিন্ন গবেষণার তাগিদে জানা যায় তুলার ব্যবহার শুরু হয় প্রায় সাত হাজার বছর পূর্ব থেকে।প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে এর বহুল ব্যবহার রয়েছে। বর্তমানের তুলার ব্যবহার হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

আমাদের এই প্রকৃতিতে কয়েক ধরনের তুলা গাছ পাওয়া যায়।গুল্মজাতীয় কিছু তুলা গাছ বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপ-গ্রীষ্মমন্ডলীয় এলাকা সমূহের বন্য পরিবেশে জন্মায়।এরকম বন্য পরিবেশের বেশিরভাগ তুলাগাছই অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা মহাদেশ এবং মেক্সিকোতে পাওয়া যায়।অর্থকরী ফসল হিসেবে তুলা জমিতে চাষ করা হয় এবং কাপড় তৈরি সহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য পরবর্তীতে একত্রিত করা হয়।আফ্রিকা,এশিয়া,ইউরোপ,অস্ট্রেলিয়া,আমেরিকা উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে তুলার খামার দেখা যায়।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় হাজার হাজার একর জমিতে তুলার চাষাবাদ হচ্ছে।ক্ষনস্থায়ী, মোটা কাপড়ের জায়গায় নিত্যনতুন জাতের তুলা গাছের ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী এবং মসৃণ কাপড়।তুলা নিজস্ব ওজনের ২৪-২৭ গুণ পানি ধারণ করতে সক্ষম।তুলা গাছের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হয়।

তুলা ফাইবার মূলত সেলুলোজ দিয়ে তৈরি।তাপমাত্রা ৭০° ফারেনহাইট (২০° সেলসিয়াস) এর বেশি না হলে সেলুলোজ তৈরি হয় না।তুলা তন্তু গুলো তুলা গাছের বীজের সাথে সম্পৃক্ত থাকে।প্রতিটি বীজের সাথে ২০,০০০ অবদি ফাইবার যুক্ত থাকে।এই তন্তু গুলোর দৈর্ঘ্যের উপর তুলার গুনগত মান নির্ভর করে,যার জন্য এটি স্ট্যাপল ফাইবার নামেও পরিচিত।দৈর্ঘ্য গুলো স্বল্প দৈর্ঘ্য, মাঝারি এবং দীর্ঘ (এবং কিছুক্ষেত্রে অতিরিক্ত দীর্ঘ) এ বিভক্ত করা হয়ঃ

*স্বল্প দৈর্ঘ্যর স্টেপল তুলার দৈর্ঘ্য ৩/৮” থেকে ১৫/১৬” (.৯৫ সে.মি. থেকে ২.৪ সে.মি.) এর মধ্যে হয়ে থাকে।

*মাঝারি দৈর্ঘ্যের স্টেপল তুলার দৈর্ঘ্য ১” থেকে ১-১/৮” (২.৫৪ সে.মি. থেকে ২.৮৬ সে.মি.) এর মধ্যে হয়ে থাকে।

*লম্বা দৈর্ঘ্যের স্টেপল তুলার দৈর্ঘ্য ১-৩/১৬” থেকে ২-১/২” (৩ সে.মি. থেকে ৬.৩৫ সে.মি.) এর মধ্যে হয়ে থাকে।

**তুলা ফাইবারের বৈশিষ্ট্যঃ

১. ৮% আর্দ্রতা ফিরে পাওয়া যায়
২. সেলুলোজ এমনভাবে সাজানো থাকে যা তুলায় শক্তি,স্থায়িত্ব এবং শোষন ক্ষমতাযুক্ত বৈশিষ্ট্য প্রদান করে।
৩. তাজা,খাস্তা,আরামদায়ক, ভালো শোষনক্ষমতা,নমনীয়, ভালো ক্ষার প্রতিরোধ ইত্যাদি ক্ষমতা বিশিষ্ট্য।
৪. অল্প কুচকানো প্রতিরোধ , সংকুচিত,দূর্বল এসিড প্রতিরোধ, কম ঘর্ষণ প্রতিরোধ ইত্যাদি ক্ষমতা সম্পন্ন।
৫. পতঙ্গ এবং জীবানু সংবেদনশীল,প্রচুর রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন এবং দাগ অপসারণ কঠিন।
৬. ফাইবারটি ১/২ ইঞ্চি থেকে ২ ইঞ্চি পর্যন্ত ভিজে গেলে এর শক্তি ১০% বৃদ্ধি পায়।

**সুতি পণ্যগুলোর বৈশিষ্ট্যঃ

১. আরামদায়ক। 
২. হাইড্রোফিলিক।
৩. আর্দ্রতা অবাধে অতিক্রম করে।
৪. উত্তপ্ত তাপ পরিবাহী।
৫. শক্তিশালী এবং ঘর্ষণ প্রতিরোধী।
৬. তুলার প্রতিকূল বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে স্থিতিস্থাপকতার অভাব রয়েছে।

**তুলার ৪ ধরনের প্রজাতি রয়েছে যেগুলো থেকেই বানিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা হয়ে থাকেঃ

১. Gossypium hirsutum : আপল্যান্ড কটন,সেন্ট্রাল আমেরিকা,মেক্সিকো, ক্যারিবিয়া এবং দক্ষিন ফ্লোরিডায় উৎপাদিন হয় যা বিশ্ব উৎপাদনের প্রায় ৯০%।
২. Gossypium barbadense : অতিরিক্ত-দীর্ঘ স্টেপল তুলা হিসেবে পরিচিত,গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দক্ষিন আমেরিকায় উৎপাদিত হয় যা বিশ্ব উৎপাদনের ৮%।
৩. Gossypium arboreum : গাছ থেকে উৎপাদিত তুলা,যার উৎপাদন ভারত ও পাকিস্তানে বেশি হয় এবং তা ২% এর ও কম।
৪. Gossypium herbaceum : লেভান্ট সুতি, দক্ষিন আফ্রিকা এবং আরব উপদ্বীপে এর উৎপাদন হয় কিন্তু এর পরিমান মোট বৈশ্বিক উৎপাদনের ২% এর কম।

**প্রস্তুতকরণঃ

* যে গাছ গুলো থেকে তুলা সংগ্রহ করা হয় তাতে বীজ থাকে।বীজ গুলো আলাদা করে নেয়া হয় বা ছাড়ানো হয়,একে Ginning বলে।এ প্রক্রিয়াটি হাত অথবা মেশিন দিয়ে করা হয়।

*তারপর ফাইবারকে সুতায় রূপান্তর করা হয়, এই ধাপকে Spinning বলে।

* একসাথে দুইসেট সুতা ব্যবহার করে ফেব্রিক তৈরি করা হয়,এই প্রক্রিয়াকে Weaving বলে।

*Knitting এর দুটি সুতা ব্যবহৃত হয় তবে আরও দুটি সুতা ব্যবহার করা যায়। এ প্রক্রিয়াটি মেশিন অথবা হাত দিয়ে করা হয়।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর তুলা উৎপাদিত হয় ২৫ মিলিয়ন টন,যা তুলা আবাদের জন্য উপযোগী জমির মাত্র আড়াই শতাংশ ব্যবহার করে উৎপাদিত হয়।২০০৯ সালের তথ্য মোতাবেক তুলা উৎপাদনকারী সর্ববৃহৎ দেশ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে চীন,দেশটি ৩৪ মিলিয়ন বেল তুলা উৎপাদন করেছিলো ওই বছরে।তারপর ভারতের অবস্থান,দেশটি উৎপাদন করেছিলো ২৪ মিলিয়ন বেল তুলা।অনেক বছর ধরে সর্ববৃহৎ তুলা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিগণিত ছিলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি ৪.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উপার্জন করেছিলো। ১৯৮০ সাল থেকে আফ্রিকা তুলা বানিজ্যে অংশগ্রহণ করে।২০১৯ সালের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৫ টি তুলা রপ্তানিকারক দেশগুলো হচ্ছে-ভারত,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,চীন ব্রাজিল,পাকিস্তানএবং তুর্কি এবং আমদানিকারক দেশগুলো হচ্ছে-কোরিয়া,তাইওয়ান,রাশিয়া,হংকং এবং জাপান।

**তুলার ব্যবহারঃ

তুলা মূলত জ্যাকেট থেকে শুরু করে শার্ট সহ বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।বাড়িতে বিছানার চাদর এবং পর্দা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।এর বীজ থেকে উৎপাদিত তেল খাদ্য হিসেবে এবং প্রসাধনীতে ব্যবহৃত হয়।কফি ফিল্টার গুলোতে ব্যবহৃত হয়।তুলা বীজ গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে এবং তেল,রাবার এবং প্লাস্টিক তৈরিতে পিষে ব্যবহার করা হয়।

তথ্যসুত্রঃ Wikipedia,Textile School,BYJU’S

Mohammad Arshil Azim 
Department of Textile Engineering 
BGMEA University of Fashion & Technology(BUFT)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here