Select Page

জেনে নিন স্পাইডার সিল্কের ইতিহাস-মাকড়সা থেকে সুতা

জেনে নিন স্পাইডার সিল্কের ইতিহাস-মাকড়সা থেকে সুতা

সিল্কের কথা বললেই একটি উপকথার গল্প চলে আসে মনে। চীনের সম্রাট হুয়াং তাই বা ইয়েলো এমপেরর-এর স্ত্রী সম্রাজ্ঞী লেই জু যখন বাগানে বসে চা পান করছিলেন তখন উপরের তুঁত গাছ থেকে একটি রেশম পোকার কোকুন এসে পড়ে সম্রাজ্ঞীর চায়ের পেয়ালায়। সম্রাজ্ঞী যখন এটি ধরে বের করে আনতে চাইলেন তখনই ঘটলো আসল ঘটনা। যতই টানেন ততই কোকুন থেকে একনাগাড়ে বেরিয়ে আসতে থাকে।

নব্য প্রস্তর যুগের শেষ দিকের ঘটনা। অন্তত ইতিহাস আর ঐতিহাসিকগণ এমনটাই বলেন। তবে কাহিনীটি সত্য না উপকথা এ নিয়েও মতভেদ আছে। তারপরও চীন সিল্ককে নিজেদের একচেটিয়া অধিকারে রাখে প্রায় তিন হাজার বছর। সেই সিল্ক চীনকে এনে দিয়েছিল অনন্য সম্ভাবনার সুযোগ। যদিও পরে নানাভাবে নানা উপায়ে সিল্ক ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়।

সিল্কের কথা সকলেই কমবেশ জানে। প্রাকৃতিক এই সুতাই একমাত্র সুতা যা পুরো কোকুন জুড়েই অবিচ্ছিন্ন থাকে। কোকুনের কথায় চলে আসে রেশম পোকা আর তুঁত গাছের কথা। কারণ রেশম পোকা তুঁত গাছের পাতা খেয়েই একসময় কোকুন তৈরী করে এবং এরপর সেখান থেকেই আসে সিল্ক সুতা।

সিল্ক মূলত প্রোটিন ভিত্তিক প্রাকৃতিক তন্তু যা বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়ার পর সুতা হিসেবে পাওয়া যায়।তবে শুনে অবাক লাগতে পারে, সিল্কের মতো এমন সুতা মাকড়সা থেকেও পাওয়া যেতে পারে। কিছুটা অবাস্তব আর আষাঢ়ে গল্পের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু এটি সত্য যে, মাকড়সা থেকে প্রাপ্ত সুতা স্টিলের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়। চলুন জানা যাক মাকড়সার সিল্ক সম্পর্কে দারুণ কিছু তথ্য।

রেশম পোকা ছাড়াও সিল্ক উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সঠিকতা আর পূর্ণাঙ্গতার অভাব রয়ে গেছে এখনও। সব প্রজাতির মাকড়সা থেকে সিল্ক প্রস্তুত করা যাবে এমনটা নয়। বিশেষ প্রজাতির মাকড়সাই এক্ষেত্রে শক্তিশালী সিল্ক তৈরী করতে পারে। মাকড়সার বিশেষত্ব হলো অবিরত সুতা তৈরীর কৌশল ও অসাধারণ জ্যামিতিক জ্ঞান সম্বলিত জাল বোনার ক্ষমতা। এই সূত্রক একইসাথে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত অন্যান্য ফাইবারের থেকে অনেকগুণ বেশি শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক। এমনকি কেভলার নামক কৃত্রিম সুতা, যা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট তৈরীতে কাজে লাগে, তার থেকেও স্পাইডার সিল্ক বেশি দৃঢ়।

আসুন জানা যাক কীভাবে মাকড়সা জাল বোনার জন্য সুতা তৈরী করে। মাকড়সার সুতা কীভাবে উৎপাদিত হয় সেটি নিয়ে গবেষকগণ অনেক গবেষণা করেছেন এ পর্যন্ত। মূলত মাকড়সার উদরের বিশেষ একপ্রকার গ্রন্থি থেকে এই সুতার জন্ম হয়। মাকড়সা সবসময় কেবল একই ধরনের সুতাই তৈরী করে না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকার সুতা তৈরী করে থাকে। উদরে উৎপন্ন এই সুতা মূলত প্রাথমিকভাবে তরল অবস্থায় থাকে এবং স্পিনারেট নামক অঙ্গাণুর সূক্ষ্ম মুখনলের মধ্যে দিয়ে বের হয়ে আসে।

স্পিনারেট সাধারণত উদরের পেছনের দিকে অবস্থান করে এবং দেখতে কোণাকার অথবা হাতের আঙুলের মতো। অধিকাংশ মাকড়সার পশ্চাৎদেশে প্রায় দুই জোড়া অর্থাৎ ৪টির মতো (প্রজাতিভেদে ২ থেকে ৮টি পর্যন্ত) স্পিনারেট থাকে। প্রতিটি স্পিনারেটে থাকে স্পিগট নামক অংশ যার মধ্যে দিয়ে এই সূত্রক বের হয়। কিন্তু তরল প্রোটিনের সুতা দিয়ে তো আর জাল বোনা সম্ভব নয়। তাই এদের স্পিনারেটে পরবর্তীতে এমন একটি পালিশ করার ব্যবস্থা থাকে, যার ফলে এই তরল প্রোটিনের আণবিক গঠনের পরিবর্তন ঘটে ও নতুন করে বিন্যস্ত হয়। এই পরিবর্তনের ফলেই বেরিয়ে আসে কঠিন সূত্রক।

এ অংশে যখন তরল প্রোটিন প্রবেশ করে তখন এ অংশের কোষগুলো প্রোটিন থেকে পানি বের করে ফেলে এবং হাইড্রোজেনকে আলাদা করে ফেলে। ফলে সেটি একপ্রকার অম্লীয় মাধ্যমে পরিণত হয়। এর কারণে তরল প্রোটিন পরিণত হয় কঠিন প্রোটিনে। সাধারণত মাকড়সা নিজেদের আবাসস্থল কিংবা আহারাদির ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে জাল বুনে থাকে। কাজেই এই জাল বা জালের সুতা এমন হতে হবে যেন পোকামাকড় যখন এতে আঘাত করবে তখন সেটা সর্বোচ্চ পরিমাণ আঘাত শোষণ করতে পারে। মূলত প্রকৃতিরই এক বিশেষ আশীর্বাদ বলা যায় একে। আর এই বিশেষ গুণই একে অন্যান্য ফাইবার থেকে আলাদা করেছে।

পাশাপাশি এর আরো একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর সূক্ষ্মতা। অর্থাৎ অন্যান্য ফাইবারের তুলনায় এটি খুবই সূক্ষ্ম এবং এর ভরও অনেক হালকা। এতটাই হালকা যে পুরো পৃথিবী একবার বেষ্টন করতে মাকড়সার যে একটানা লম্বা সূত্রকের প্রয়োজন হবে তার ভর হবে খুব বেশি হলে মাঝারি আকৃতির একটি সাবান খণ্ডের ভরের সমান!

মাকড়সার সুতা যে শক্তিশালী এবং স্থিতিস্থাপক সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। মুশকিল হচ্ছে এই সুতা আহরণ ও উৎপাদন করার যায় কীভাবে সেটা নিয়ে। সাধারণ রেশম পোকা যেমন আমরা চাষ করতে পারি মাকড়সার চাষ করা আসলে ততটা সহজ নয়। কারণ একে তো সব প্রজাতির মাকড়সাই এই শক্তিশালী সুতা তৈরী করতে পারে না, অন্যদিকে মাকড়সা সবসময় একই প্রকার সুতা প্রদানও করতে পারে না। সবচেয়ে কঠিন সমস্যা এই যে মাকড়সা কলোনিভুক্ত প্রাণী নয়। কাজেই এদের একত্রে চাষ করা অসম্ভব।

অন্যদিকে গবেষকগণও কৃত্রিমভাবে মাকড়সার সুতা গবেষণাগারে তৈরী করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু তরল প্রোটিনকে কঠিন ও দৃঢ় করাটাই এখন তাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এটি মাকড়সার দেহে ঘটে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায়। সেটা কৃত্রিমভাবে তৈরী করতে গেলে আমাদের এখনো অনেক গবেষণা করতে হবে এবং অপেক্ষা করতে হবে।

এখন প্রশ্ন থাকতে পারে যে, আমরা তাহলে স্পাইডার সিল্ক পাবো কীভাবে। কারণ একদিকে মাকড়সা থেকে সবসময় সিল্ক পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, আবার গবেষণাগারে এখনো ঠিক সেভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই এটার আসলে এখনই কোনো উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।

তবু অনেকেই এই মাকড়সার সুতা আহরণে চেষ্টা করেছেন এবং সেই সিল্ক দিয়ে ফেব্রিকও বোনা হয়েছে। ছবিতে যে সোনালী ফেব্রিক দেখানো হয়েছে সেটি প্রস্তুত করতে প্রায় ৭০ জন মানুষের সময় লেগেছে ৪ বছর। এই ফেব্রিক তৈরী করা হয়েছে প্রায় এক মিলিয়ন Golden orb প্রজাতির স্ত্রী মাকড়সা হতে প্রাপ্ত সিল্ক থেকে। ব্যাপারটা মোটেও সহজ ছিল না।

এই ৭০ জন মানুষ প্রায় ৪ বছর ধরে মাদাগাস্কারের বিভিন্ন এলাকার টেলিফোন পোল থেকে মাকড়সা সংগ্রহ করেছেন এবং আরো প্রায় ১২ জন মানুষ এসব মাকড়সা থেকে আহরণ করেছে সিল্ক। প্রতিটি মাকড়সা থেকে আহরণ করা হয়েছে প্রায় ৮০ ফুটের মতো সুতা যা ব্যবহার করে তৈরী হয়েছে এই ১১ ফুট দৈর্ঘ্য আর ৪ ফুট প্রস্থের ফেব্রিকখানি। মূলত এটিই প্রথম ফেব্রিক যা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক মাকড়সার সুতা দিয়ে তৈরী করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে মাকড়সা থেকে সুতা আহরণের যে যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি একসাথে ২৪টি মাকড়সার সুতা আহরণ করতে পারে। মাকড়সার কোনো ক্ষতি না করেই করা হয় এই আহরণ কর্ম। আহরিত সুতা হতে দেখা যায় যে, ১৪ হাজার মাকড়সা থেকে যে পরিমাণ সুতা পাওয়া যায় তার ভর খুব বেশি হলে এক আউন্সের মতোই হবে এবং বয়নকৃত ঐ ফেব্রিকের ভর ছিল প্রায় ২.৬ পাউন্ডের মতো। অর্থাৎ এরা অন্যান্য ফাইবার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হালকা হবে।

কিন্তু এত বিশেষ সব বৈশিষ্ট্য থাকার পরও মাকড়সা চাষ করার কোনো পদ্ধতি আবিষ্কৃত না হওয়ার কারণে কেবল প্রাকৃতিক মাকড়সার উপর নির্ভর করতে হয় আমাদের। আবার প্রাকৃতিক মাকড়সা থেকে একনাগাড়ে সুতা আহরণ করা হলেও একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতা আহরণ করার পর থেকে যে সুতা পাওয়া যায় তা আগের সুতার মতো কঠিন ও স্থিতিস্থাপক থাকে না।

মাকড়সা আহরণের জন্যও উপযুক্ত মানুষের প্রয়োজন। কারণ মাকড়সার দংশনের ভয়ও থাকে যথেষ্ট। আবার বর্ষার মৌসুম ছাড়া এই বিশেষ প্রজাতির মাকড়সা তাদের বিশেষ ধরনের সিল্ক তৈরী করে না। একবার সিল্ক আহরণ করার পর মাকড়সা প্রায় এক সপ্তাহ সময় নেয় নতুন করে একই প্রকার শক্তিশালী সুতা তৈরী করার জন্য।

গবেষকগণ তাই অবিরত চেষ্টা করে যাচ্ছেন কীভাবে গবেষণাগারে তৈরী করা যায় স্পাইডার সিল্ক। কিন্তু কিছু সমস্যা থেকেই যায়। কারণ এই সিল্কের প্রকৃত জীন অনুক্রম এখনো পুরোপুরি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে সমর্থ্য হননি। যদি সেটা পাওয়া যায় তবে সেটা অন্যান্য অণুজীবের শরীরে স্থাপন করে হয়তো প্রচুর পরিমাণে সিল্ক পাওয়া সম্ভব হবে যা হবে একই সাথে শক্তিশালী ও সহজলভ্য।

তথ্যসূত্র – Roar বাংলা

About The Author

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




Grow up your business

TextileEnginerrs










April 2020
MTWTFSS
« Mar  
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930