Home Traditional Textile কার্পেটের/গালিচার আদ্যোপান্ত (পর্ব -২)

কার্পেটের/গালিচার আদ্যোপান্ত (পর্ব -২)

গালিচা রহস্য :

গত পর্বে আমি গালিচা বা কার্পেটের ইতিহাস নিয়ে জানানো চেষ্টা করছি।  এবার জানানোর চেষ্টা করব নানান রকম গালিচা ও তার ডিজাইন নিয়ে।  কোন নির্দিষ্ট গালিচা নিয়ে কথা বলতে সবার আগে আসবে রেড কার্পেট বা লাল গালিচার নাম। 

রেড কার্পেট বা লাল গালিচা : 

ঐতিহ্যগতভাবে, কোন রাষ্ট্রীয় অতিথিকে স্বাগত জানানোর জন্য এবং বর্তমানে প্রথাগত কোনও অনুষ্ঠানে কোনও অতিবিশিষ্ট বা মহামান্য ব্যক্তি ও তারকাদের সংবর্ধনা দেয়ার জন্য লাল গালিচা ব্যবহার করা হয়। লাল গালিচা পরিচিতি পাওয়ার শুরু থেকেই সম্রাট কিংবা উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের পায়ের ধুলোকে বহন করে চলেছে। তবে আধুনিককালে একে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় করেছে হলিউডের খ্যাতনামা তারকারা। 

এখন পর্যন্ত জানা, খ্রিস্টপূর্ব ৪৫৮ সালে লিখিত প্রাচীন সাহিত্য ইস্কাইলাস অ্যাগামেনন-এ সর্বপ্রথম লাল গালিচার উপর হাঁটার উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রিসের সম্রাট অ্যাগামেনন যখন ট্রয় থেকে ফিরে আসেন তখন তার প্রতিহিংসাপরায়ণ স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রা তাকে একটি লাল পথের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। অ্যাগামেননে লাল গালিচাকে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে, এটাতে হাঁটার একমাত্র ক্ষমতা একমাত্র সৃষ্টিকর্তারই বলে গ্রিসের সম্রাট অ্যাগামেনন মনে করেছিলেন।

 তবে আধুনিক যুগে, ১৮২১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর সাউথ ক্যারোলাইনায় আগমনকে স্বাগত জানাতে সেখানে লালগালিচা ব্যবহার করা হয়েছিলো বলে জানা যায়। এরপর থেকেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সম্মান প্রদর্শনে লালগালিচা ব্যবহার করা হয়ে থাকে।  লালগালিচাকে আধুনিককালে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় করেছেন হলিউড তারকারা। মূলত বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রে চলচ্চিত্রশিল্পের ব্যাপক উন্নতি ঘটে এবং হলিউডের তারকাদেরও অভিজাত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো ১৯৬১ সালে অস্কার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সম্মানে লালগালিচার প্রচলন করা হয়।

মধ্যযুগের ইউরোপে লাল রং কে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হতো। তাই রেনেসাঁ যুগের শিল্পকর্মে সাধু, সম্রাট কিংবা অভিজাত ব্যক্তিদের পায়ের নিচে লালগালিচার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। লাল রঙের গালিচা ছাড়াও বর্তমানে বিভিন্ন রঙের গালিচা ব্যবহার করা হয়। যেমন, বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষকের লোগোর রঙের উপর নির্ভর করে, পরিবেশগত সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ‘সবুজ গালিচা’, কোন কমিউনিটির প্রধান চিত্রের রঙের সাথে মিল রেখে ‘কমলা রঙের গালিচা’, ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

প্রাচীনতম কার্পেট : 

সবচেয়ে প্রাচীন কার্পেট হলো “পাজিরিক” কার্পেট। প্রায় ২৫০০ বছর আগে প্রতিসম ডাবল গিঁট কৌশল ব্যবহার করে বোনা হতো কার্পেটগুলো। আমাদের যুগের তৃতীয় শতাব্দীতে প্রাচীন পার্সিতে (ইরান) কার্পেট শিল্পের খুব জনপ্রিয়তা ছিল । সেই সময়ের কার্পেটে পূর্ববর্তী জনগোষ্ঠীর ছাপ বিদ্যমান ছিল, যা তাদের জীবনধারার কারণে ছিল। রুশ পুরাতত্ত্ববিদ এস. এ. রুদাঙ্কু ১৯৪৯ সালে পাজিরিক টিলায় এবং সাকা শাহীদের সমাধিস্থলে খনন কাজ চালিয়ে ওই কার্পেট আবিষ্কার করেছিলেন। বিভিন্ন রঙের পশম দিয়ে তৈরি করা ওই কার্পেট যে ইরানি ছিল তার পক্ষে বহু ঐতিহাসিক প্রমাণ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কার্পেটটি এখন রাশিয়ার সেন্টপিটার্সবার্গের ‘অর্মিতাজ’ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

প্রদর্শনীর জন্য রাখা সবচেয়ে বড় কার্পেট : 

কার্পেটের বিশাল মাপের অ্যাশাগাবতকে কার্পেটের জাদুঘরে রাখা হয়। তাদের মধ্যে একজনকে “তুর্কমেনি কালবা” বলা হয়, যা রাশিয়ান ভাষায় অনুবাদ করা হয় “তুরস্কের মন্দির”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোনা, এই কার্পেটর এলাকা একশত নব্বই বর্গমিটার। এছাড়া রেকর্ড এ  “তুর্কমেনিয়া মন্দির” এ একটি দৈত্য কার্পেট এক হাজার দুইশত কিলোগ্রাম ওজন হওয়ার পরে ভাঙ্গা ছিল। তাদের দ্বারা দখল এলাকা – তিনশত এক বর্গ মিটার। এটি যদিও বড় কার্পেট না বিশ্বের কিন্তু প্রদর্শনীর জন্য রাখা বড় কার্পেট বলে রেকর্ড ধারক গিনেস ওয়ার্ল্ড বুকে তালিকাভুক্ত করা হয়।

হাতে নির্মাণ করা এবং বিশ্বের বড় কার্পেট : 

আজকের দিনে, বিশ্বের বৃহত্তম কার্পেট একটি ফুটবল মাঠের সাথে তুলনীয়। আরব আমিরাতের মসজিদের জন্য বিশেষভাবে বোনা একটি চ্যাপেল কার্পেট।” শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ ” এই মসজিদের মেঝেতে সাজানো আছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি কার্পেট। বলা হয়, এই কার্পেটটিই বিশ্বের সর্ববৃহৎ কার্পেট। কার্পেটের নকশা করেছিলেন ইরানি নকশাকার আল খালিকি। আল খালিকির আগের প্রজন্মও কর্মরত ছিলেন কার্পেট নকশার পেশায়। তিনি তৃতীয় প্রজন্মের নকশাকার। বৃহৎ এই কার্পেটের আয়তন ৫৬২৭ ঘন মিটার (৬০,৫৭০ বর্গ ফুট)। কার্পেটের নকশায় কাজ করেছিলেন ১২০০ তাঁতি, ২০ জন টেকনিশিয়ান এবং ৩০ জন শ্রমিক। দারুণ নকশায় সজ্জিত এই কার্পেটের ওজন ৪৭ টন যার মধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে ৩৫ টন উল এবং ১২ টন কটন। কটনের সংখ্যা ছিল ২২৬৮০০০০০০টি।  এই অনন্য কার্পেট তৈরি করতে খরচ সাত শত মিলিয়ন ডলার। 

২০০৭ সালের আগে, ওমানের সবথেকে বড় মসজিদ ‘সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড’ এ থাকা কার্পেটটিকে বিশ্বের সবথেকে বড় কার্পেট হিসেবে গিনেসরেকর্ড বুকে নাম লিখা আছে। মেঝেজুড়ে বিছানো সেই বিখ্যাত কার্পেট। এক সময় বিশ্বের হাতে বোনা টুকরাবিহীন কার্পেট, এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম। আয়তন ৪ হাজার ৩৪৩ বর্গমিটার। ওজন ২১ মেট্রিক টন। ক্লাসিক্যাল, তাব্রিজ, কাশান এবং ইসাফাহান ঐতিহ্যের নকশায় ১৭০ কোটি সুতার বন্ধনে বোনা। নানা রঙের বিন্যাস ২৮টি স্তরে। ৬০০ ইরানি নারী চার বছর ধরে এটি বুনেন। সরবরাহ করে বিশ্বখ্যাত ইরান কার্পেট কোম্পানি।

বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কার্পেট :

“পার্ল কার্পেট” গিনেস বুকের রেকর্ড অনুযায়ী সবচেয়ে ব্যয়বহুল কার্পেটের একটি নাম। এটি ভারতীয় শাসকের আদেশ অনুসারে ১৮৬০ সালে তৈরি করা হয়েছিল। একটি সিল্ক কার্পেটে হিরা , নীলকান্তমণি এবং পান্না মুক্তা চূর্ণর সঙ্গে সজ্জিত করা হয়। শিল্পের এই কাজের প্রতিটি বর্গমিটারে আছে পাঁচ হাজার জপমালা এবং মুক্তা। এই মূল্যবান পণ্যটি SOTHEBYS নিলামে প্রদর্শিত হয়েছিল, যেখানে তিনটি ক্রেতারা এই অনন্য কার্পেটের অধিকারের জন্য লড়াই করেছিল। পরে এটি ১০০ লাখ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে এটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল হিসাবে কার্পেটটির মধ্যে পড়েছিল।

বিশ্বের দ্বিতীয় সবচেয়ে দামি কার্পেটের নাম “সিল্ক ইসফাহান কার্পেট”। ইরানের একটি শহরের নাম ইসফাহান, সেখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত কর্মশালার নাম “সীরাফিয়ান”। মাস্টার মোহাম্মদ সীরাফিয়ান এই কার্পেট টি তৈরী করেন যার প্রতি বর্গমিটারে আছে ১০ লাখ গিঁট। এটি ২০০৮ সালে ৪৪,৫০,০০০ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। 

References : 

  1. Wikipedia 
  2. Prothom Alo Online Portal
  3. Pars Today 
  4. Salam web Today
  5. Textile Today 

Written by: 
Md. Nazmul Hasan Nazim 
Member of TES
National Institute of Textile Engineering and Research 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author

error: Content is protected !! Don\\\\\\\\\\\\\\\'t Try to Copy Paste.