Home Traditional Textile মসলিন এক হারানো ঐতিহ্য

মসলিন এক হারানো ঐতিহ্য

বিশ্বব্যাপি খ্যাত মসলিন আমাদের বর্তমান ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার স্থানীয় কারিগর দ্বারা তৈরি করা হতো। এই মসলিন ‘ঢাকাই মসলিন’ নামে অনেক সমাদৃত ছিল। এই মসলিনের খ্যাতি পৃথিবী ব্যাপী এতই ছিল যে ১৮৫১ সালে মসলিনের বিশাল প্রদর্শনীতে ঢাকাই মসলিন বিশেষ প্রাধান্য পায়। মূলত মসলিন বস্ত্র তৈরি হতো সবচেয়ে মিহি ৩০০ কাউন্টের সুতা দিয়ে। আর এই সুতা তৈরি করা হতো বিশেষ ধরণের ফুটি কার্পাস নামক তুলে থেকে। এই তুলা ব্রক্ষপুত্র নদীর তীরে জন্মাত। এই কার্পাস চাষাবাদরে ছিল অনেক নিয়ম কানুন। কার্পাসের বীজ বছরে দুই বার বপন করা হতো, শরৎ এবং বসন্তকালে। বসন্তকালের কার্পাস থেকে উৎপন্ন তুলাকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মনে করা হতো। এরপর তুলা থেকে বোয়াল মাছের চোয়ালের বানানো দাঁত দিয়ে অপদ্রব্য পরিষ্কার করা হতো। এরপর তুলা থেকে সুতা কাটার কাজ করতেন বাড়ির নারী সদস্যরা। শুকনো বাতাস বইতে থাকলে সুতা কাটা সম্ভব ছিল না। তাই খুব ভোর থেকে শুরু করে সকালে রোদ ওঠার আগে এবং বিকালে সূর্যাস্তের আগে সুতা কাটার কাজটি করা হতো। এই সুতা থেকে হাতে চালানো তাঁতে তৈরি করা হতো মসলিন কাপড়। এছাড়া আরো দুই ধরণের তুলা ছিল দেশী ও বয়রাতি। এসব তুলা থেকে অপেক্ষাকৃত কম সূক্ষ্ণ ও মোটা কাপড় তৈরি করা হতো। এসব কাপড়ের সূক্ষ্ণতা, উৎপাদনের উৎস ও ব্যাবহার ভেদে বিভিন্ন নাম ছিল। নামগুলো হলো মলমল, ঝুনা, রঙ্গ, তনজিব, জামদানি ইত্যাদি। এরমধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্ণ মসলিন এর নাম ছিল মলমল। এই বস্ত্র সাধারণত সম্রাট ও নবাবাগণই ব্যাবহার করতেন। মসলিন অত্যন্ত উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। ধনী ব্যাক্তিবর্গরাই এটি বেশি ব্যবহার করতেন। কিন্তু এই মসলিন যারা তৈরি করতো সেই তাঁতিরা কখনোই এর সঠিক মূল্য পাই নি। তারা প্রচণ্ড দারিদ্র জীবন যাপন করতো এবং বৃটিশদের দ্বারা ছিল নির্যাতনের শিকার।কথিত আছে, ব্রিটিশরা দক্ষ মসলিন তাঁতীদের হাতের আঙ্গুল কেটে দিয়েছিল। এছাড়া ইউরোপে কাপড়ের কল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর মসলিনের চাহিদা কমে যাওয়ায় বাংলা থেকে মসলিন রপ্তানি কমে যায়। এইসব বিভিন্ন কারণে মসলিন বাংলা থেকে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।


বর্তমানে যেহেতু সেই বিশেষ ধরণের সেই ফুটি কার্পাস তুলার বীজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে তাই সম্পূর্ণ রূপে ঢাকাই মসলিন তৈরি করা সম্ভব নয়, কিন্তু মসলিনের কাছাকাছি সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। মসলিনের একটি শাখা ‘জামদানি’ এখনো টিকে আছে এবং এই বস্ত্র আমাদের দেশে খুবই সমাদৃত। তবে আশার বাণী এই সেই হারিয়ে যাওয়া ফুটি কার্পসের একটি জাত শনাক্ত করা হয়েছে এবং তার পরীক্ষামূলক চাষ হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ৩০০ কাউন্টের সুতায় তৈরি ১৭০ ওজনের একটি শাড়ি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রনালয়। নিজস্ব সম্পদ হিসেবে ভৌগোলিক নির্দেশক (জি আই) সনদ পেতে আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব সংস্থা ডিব্লিউআইপিও বরাবর আবেদনও করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, roarmedia

মাসরুর মোর্তুজা
বস্ত্রকৌশল বিভাগ, ২য় বর্ষ,
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Post

Most Popular

Related Post

Related from author