কলা যখন ফাইবার

0
595

Banana বা কলা একটি ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত উপাদেয় ফল। ছোট, বড়, বৃদ্ধ এমন কোনো মানুষ নেই যে কলা খেতে পছন্দ করে না। একটি কলা গাছ ৭/৮ টি লম্বা পাতা এবং ১০ থেকে ১৫ ফুট লম্বা কান্ড যুক্ত।কলা গাছের প্রতিটি অংশ ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে কলা গাছের কান্ডের জুস অনেক রোগের নিরাময় হিসেবেও কাজ করে আর এই কলা গাছের কান্ড থেকে টেক্সটাইল জগতে আবির্ভাব হয়েছে Banana ফাইবারের।

এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগ্রত হতে পারে যে Banana ফাইবার কি এবং কিভাবে এটি থেকে ফাইবার তৈরি সম্বব ? আসলেই কি সম্ভব ?

জি, হ্যা !!

সম্ভব এবং এটি একটি পরিবেশবান্ধব ফাইবার। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, পাকিস্তান সহ বিশ্বের অনেক দেশে কলা বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করা হয়। আর এ থেকে প্রতি বছর প্রচুর পরিমানে কলা কান্ড পচে পরিবেশে উপর চাপ প্র‍য়োগ করে এবং দূষণ সৃষ্টি করে। কলা গাছে প্রচুর পরিমানে সেলুলোজ রয়েছে আর এই চিন্তা ধারা থেকে সৃষ্টি হয়েছে Banana ফাইবারের। এটির প্রথম প্রচলন ফিলিপাইনে হলেও আস্তে আস্তে তা উপমাহাদেশে ছড়িয়ে পরেছে। এরই ধারাবাহিতায় ভারতের মধ্যপ্রদেশের ছোট্ট গ্রাম বোরহানপুরের মেহুল শ্রফ Banana ফাইবারের বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদন করেন এবং এর বাজারজাত শুরু করেছেন। Banana ফাইবার উৎপাদনের জন্য প্রথমত জমি থেকে কলা সংগ্রহ করার পর কলা কান্ড সংগ্রহ করা হয় ফাইবার তৈরির জন্য। একটি কলা গাছে মূলত ২০ থেকে ৩০ উপকান্ড রয়েছে যেগুলাকে অঞ্চলিক ভাবে ঢোংলা বা শীট বলা হয়ে থাকে। এগুলা হাতে (ম্যানুয়ালি) আলাদা করে শক্ত আবরন থেকে পাতলা ফাইবার আলাদা করা হয়। এরপর এগুলা ঘূর্নিত চাকায় সংযুক্ত করে হালকা ভাবে ঘুরানো হয়। এতে করে এর ভিতরকার অতিরিক্ত তরল পদার্থ আলাদা হয়ে যায়। এরপর এই ফাইবার গুলো পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হয়। পর্যাপ্ত পরিমানে শুকানো হবার পর শর্ট এবং লং ফাইবার আলাদা করে ৩০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৩ ঘন্টা যাবত সিদ্ধ করা হয়। এর পর আবার শুকানো হয়। এরপর এই শর্ট ফাইবার এবং লং ফাইবার ডায়িং করে স্পিনিং এর জন্য প্রস্তুত করা হয়। ডায়িং, স্পিনিং এবং উইভিং এর পর Banana ফেব্রিক রোলার বা বিমে জড়ানো হয় এবং গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাটিং টেবিলে নির্দিষ্ট প্যাটার্ন অনুসারে কাটা হয় এবং এরপর সেলাই করে অ্যাপ্পারেল পাওয়া যায়।

Banana ফাইবার কত প্রকার ও কি কি ?

সব মিলিয়ে মোট ৪ ধরনের Banana ফাইবার বিদ্যমান। সেগুলা নিচে উল্লেখ করা হলো:-

➤ Inner-Peel Banana Fiber: এই ফাইবার সিল্কে ফাইবারের মতোই নরম এবং সূক্ষ্ম। এটি তুলনামূলক ব্যয়বহুল প্রোডাকশন এর জন্য। এই ফাইবার থেকে মূলত শার্ট, প্যান্ট, টি শার্ট, গেঞ্জি ইত্যাদি বানানো হয়।

➤ Outer-Peel Banana Fiber:
এই ফাইবার গুলা মোটামুটি শক্ত এবং রুক্ষ। এর সাহায্যে দড়ি, কার্পেট, ভারী কাপড় ইত্যাদি বানানো যায়।

➤ Banana Cotton: এটি উচ্চ মানের Outer Peel Banana Fiber. এর বৈশিষ্ট্য অনেকটা Cotton এর মতো। এর সাহায্যে প্যান্ট,শার্ট,টুপি,হোম টেক্সটাইল বানানো হয়

➤ Banana Silk: এটি উচ্চমানের Inner Peal Banana Fiber যেটি সিল্কের ন্যায়।

Banana ফাইবারের বৈশিষ্ট্য সমূহ:-

➤ এই ফাইবারের নিজস্ব কেমিক্যাল এবং ফিজিক্যাল গঠন বিদ্যমান। এর কারনে এই ফাইবার যথেষ্ট সূক্ষ্ম এবং হালকা ওজনের।
➤ এটি Bambo এবং Ramie ফাইবারের ন্যায়। কিন্তু Banana ফাইবারের সূক্ষ্মতা এবং বুনন সক্ষমতা উক্ত দুই ফাইবারের থেকেও বেশি।
➤ যথেষ্ট শক্তি সম্পন্ন এবং হালকা ওজনের এই ফাইবার।
➤ গড় সূক্ষ্মতা ২৪০০ ন্যানোমিটার।
➤ কেমিক্যাল উপাদান সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ এবং লিগনিন।
➤ উচ্চপানি শোষণ ক্ষমতা সম্পন্ন।
➤ পরিবেশবান্ধব ফলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না।

Assorted-color Yarns on Brown Wicker Basket
Banana Fiber থেকে তৈরিকৃত সুতা !!

নিচে এই ফাইবারের বিভিন্ন বৈশিষ্ট আর উপাদানের পরিমান উল্লেখ করা হলো :-

প্রতি একক ভরে বাহ্যিক বল সহনশীলতার পরিমানঃ ২৯.৯৮ গ্রাম/ডেনিয়ার
আদ্রতা শোষণ সক্ষমতাঃ ১৩.০০%
সেলুলোজের পরিমানঃ ১৮১.৮০%
আলফা সেলুলোজঃ ৬১.৫%
গামঃ ৪১.৯০%
লিগনিনঃ ১৫.০০%
স্ট্রেন্থঃ ৫২৯-৯১৪ মেগা-প্যাসকেল
ঘনত্বঃ ৭৫০-৯৫০ কেজি/ঘনমিটার

Banana ফাইবারে ব্যবহার:- শার্ট, প্যান্ট, টুপি, গেঞ্জি, টি-শার্ট, দড়ি, কার্পেট, কাগজ, হোম টেক্সটাইল ইত্যাদি।

Banana ফাইবারের উপকারিতা এবং এর সাথে পরিবেশের সম্পর্ক :

➤ Banana ফাইবার চাষের জন্য আলাদাভাবে জমি প্রস্তুত করার প্রয়োজন নেই। প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়। মূলত গাছের কান্ড থেকে ফাইবার উৎপাদন হয়। ফলে কান্ড গুলা একদিক থেকে পরিবেশের দূষণ রোধ হবে অন্যদিকে ফাইবার প্রোডাকশন হবে যা দিয়ে কাপড় সহ অনেক গার্মেন্টস তৈরি হবে। তুলা এবং সিল্ক এর চাষ থেকে এটি অনেক লাভজনক এবং খরচ কম।আমরা জানি স্যানিটারি প্যাড মহিলাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু। Menstrual Hygiene Alliance Of India (MHAI) এর মতে পুরো ভারতে প্রায় ৩৩৬ মিলিয়ন ঋতুস্রাবী নারী বিদ্যমান এর মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ বা প্রায় ১২০ থেকে ১২৪ মিলিয়ন মহিলা প্রতি বছর ডিসপোজেবল স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে থাকে। প্রতি বছর প্রায় ১২ থেকে ১৩ বিলিয়ন স্যানিটারি প্যাড শুধু ভারতের নারীদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, যার বেশির ভাগই নন-বায়োডিগ্রেডেবল বা অপচনশীল। এসব প্যাডের বেশির ভাগ ই সিন্থেটিক এবং প্লাস্টিক সামগ্রী দিয়ে তৈরি। এসব প্যাড মাটির সাথে মিশতে বা পচন ধরতে ৫০-৬০ বছরের ও বেশি সময় লাগে। এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র একটু দেশের এ থেকেই ধারণা করা যায় বিশ্বব্যপী পরিবেশ দূষণে প্লাস্টিকের স্যানিটারি প্যাডের ভূমিকা কতটুকু। এরই ধারাবাহিতায় ভারতে Sanfe Pharmaceuticals Ltd. ২০১৯ সালের ২৯ আগস্ট Banana ফাইবার থেকে বায়োডিগ্রেডেবল স্যানিটারি প্যাডের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করে। তারা জানায় এই স্যানিটারি প্যাড প্রায় একাটানা ২ বছর ধরে ব্যবহার করা যাবে এবং ১২০ বার পর্যন্ত ওয়াশ করা যাবে।

Banana ফাইবার উচ্চ সেলুলোজ এবং উচ্চ পানি শোষণকারী ফলে এর থেকে তৈরি স্যানিটারি প্যাড একদিকে নারীদের সুরক্ষা দিবে অপরদিকে এটি মাত্র ১২০ থেকে ১৫০ দিনে পরিবেশের মাটির সাথে মিশে যেতে সক্ষম। সর্বোপরি পরিবেশ স্যানিটারি প্যাডের দূষণ থেকে মুক্তি পাবে। এছাড়াও কাগজ তৈরিতে প্রচুর বাঁশ এবং কাঠের প্রয়োজন হয়। ফলে প্রচুর পরিমানে গাছ কাঁটা হয় যার কারনে পরিবেশে কার্বন ডাই-অক্সাইড দিন দিন বেরেই যাচ্ছে। কাগজ তৈরিয়ে Banana গাছ হতে পারে তার উত্তম বিকল্প। Banana ফাইবার একদিকে পরিবেশ থেকে অতিরিক্ত বর্জ্য অপসারনে সাহায্য করছে। অপরদিকে টেক্সটাইল সেক্টরকে উপহার দিয়েছে নতুন এক দিগন্ত।

Writer Information:

Name: Md.Murad Hassan
Department: Textile Engineering
Batch: 192
Institution: Primeasia university
Number: 01785437198
Email: [email protected]
Campus Ambassador (TES)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here