বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের শুরুর গল্প

0
4050

বস্ত্র হচ্ছে মানুষের ৫টি মৌলিক চাহিদার মধ্যে একটি। জীবনধারণের জন্য যেমন অন্ন প্রয়োজন, ঠিক তেমনই সমাজে বসবাস করার জন্য মানুষের প্রয়োজন  বস্ত্র। প্রাচীনকালে মানুষ তাদের বস্ত্রের চাহিদা মিটাতো গাছের লতা,পাতা,ছাল এবং পশুর চামড়া দিয়ে এবং পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আঁশ,সুতা এবং কাপড়ের ব্যবহার রপ্ত করে। কবে ,কখন এবং কোথায় প্রথম কাপড়ের ব্যবহার শুরু হয় সেই তথ্যটি এখনো সঠিক ভাবে জানা যায় নি তবে এইকথা সত্য যে, এক সময়ে মানুষ নিজেরাই সুই সুতা দিয়ে সেলাই করে নিজেদের পোশাক তৈরি করত। ধীরে ধীরে যুগের ক্রমান্বয়ে মানুষ সেলাই মেশিনের সাহায্যে পোশাক তৈরি করতে থাকে। সেলাই মেশিনের সাহায্যে মানুষের পোশাক সেলাই করার ইতিহাস মাত্র ২৬০ বছর আগের কাহিনী । সেলাই মেশিনের উদ্ভাবিনের প্রাচীন ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, ১৭৫৫ সালে ইংল্যান্ড এর চার্লস ফ্রেডরিক প্রথম যান্ত্রিক সেলাই মেশিন আবিষ্কার। তখন সেই সেলাই মেশিন দ্বারা হ্যান্ড স্টিচের ন্যায় স্টিচ উৎপন্ন করা যেত। বাণিজ্যিকভাবে ১৮৫১ সালে ইসাক মেরিট সিঙ্গার সফল সেলাই মেশিন আবিষ্কার করেন।

দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সারা পৃথিবীতে যে কয়েকটি কারণে পরিচিত হয়েছে তার মধ্যে পোষাক শিল্প অন্যতম। পোশাক রপ্তানিত শিল্পে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২য়। প্রতিবছর শুধু মাত্র আমাদের দেশের উৎপাদিত পোষাক বিদেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদিশিক মুদ্রা আয় করে। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবন নির্ভর করে এই গার্মেন্টস শিল্পের উপর। আজ আমরা জানবো বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:

পৃথিবীর প্রথম পোশাক তৈরির কারখনা স্থাপিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ১৮৩১ সালে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প যাত্রা শুরু করে ষাটের দশকে। তবে সত্তরের দশকের শেষের দিকে রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে এই শিল্পের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিমুখী শিল্পখাত। পোশাক শিল্প তৈরী পোশাক বা আরএমজি নামে অধিক পরিচিত। সুবিন্যস্ত কারখানায় বৃহদায়তনে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পোশাক উৎপাদনের ঘটনা বাংলাদেশে তখন অপেক্ষাকৃত নতুন। ১৯৬০ সালে ঢাকার উর্দু রোডে রিয়াজ ষ্টোর নামে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের প্রথম গার্মেন্টস। ১৯৬৫ সালে রিয়াজ ষ্টোর এর মালিক জনাব রিয়াজ উদ্দিন করাচি ভ্রমণকালে একটি গার্মেন্টসকে মাসে ১ লক্ষ পিস পোশাক রপ্তানী করতে দেখেন। তখন থেকেই তিনি বাংলাদেশ থেকে তৈরিকৃত পোশাক বিদেশে রপ্তানীর স্বপ্ন দেখতে থাকেন। প্রথমদিকে তারা দেশের চাহিদা পূরণ করতে থাকে। এর ১৯৬৭ সালে রিয়াজ স্টোর এর উৎপাদিত ১০,০০০ পিস শার্ট বাংলাদেশ হতে সর্বপ্রথম দেশের বাইরে (যুক্তরাজ্যে) রপ্তানি করা হয়। এরপর ১৯৭৩ সালে তিনি “রিয়াজ ষ্টোর” এর নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করেন “রিয়াজ গার্মেন্টস”। এছাড়া অইসময়ের আরো একটি গার্মেন্টস এর নাম শোনা যায়, যেটি হচ্ছে “দেশ গার্মেন্টস”। দেশ গার্মেন্টস ছিলো সেই সময়ের ১০০% এক্সপোর্ট অরিয়েন্টেড গার্মেন্টস। ৭০ এর দশকের শেষের দিকে এদেশে ছিলো শুধুমাত্র ৯টি রপ্তানিমূখী প্রতিষ্ঠান যারা ইউরোপের বাজারে ১০লাখ মার্কিন ডলারের ব্যবসা করতো প্রতিবছর। সেইসময় ৩টি বড় ও সুপ্রসিদ্ধ পোশাক কারখানা ছিলো দেশে। সেগুলো হল- রিয়াজ গার্মেন্টস, প্যারিস গার্মেন্টস, জুয়েল গার্মেন্টস। এছাড়া সেই সময়ে ‘বন্ড গার্মেন্টস’-এর মরহুম আখতার মোহাম্মদ মূসা, ‘প্যারিস গার্মেন্টস’-এর মোঃ হুমায়ুন, আজিম গ্রপের প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ফজলুল আজিম, সানম্যান গ্রুপের মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান, স্টাইলক্রাফট লিমিটেডের উদ্যোক্তা এম. শামসুর রহমান, বিজিএমইএ’র প্রথম সভাপতি, অ্যারিস্টোক্র্যাট লিমিটেডের উদ্যোক্তা এ. এম. সুবিদ আলী প্রমুখ ব্যাক্তিবর্গ এগিয়ে আসেন এবং আমাদের দেশে আরো কয়েকটি গার্মেন্টস কারখানা তারা প্রতিষ্ঠা করেন।

গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে  ১৯৮১-৮২ সালে ০.১ বিলিয়ন টাকার রেডিমেইড গার্মেন্টস রপ্তানি করে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের পদচারনা হয়। উক্ত সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস শিল্পের তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিলো না। ১৯৮২ সালে দেশে গার্মেন্টস ছিলো ৪৭টি যার সংখ্যা ১৯৮৫তে গিয়ে দাঁড়ায় ৫৮৭টি। কম উৎপাদন খরচ ও স্বল্প শ্রমমূল্য হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগের স্থান পায়। এরপর আর পিছনে ফিরে দেখতে হয় নি। ১৯৯৯ সালে এদেশে গার্মেন্টস সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯০০টি। ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ এই ১০ বছরে এই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় ১৪৪৫ ইউএস ডলার। ১৯৮৩-৮৪ সালে এই খাত থেকে আয় হয় ০.৯বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ওইসময়কার মোট জিডিপির ৩.৮৯শতাংশ এবং সেই রপ্তানি ১৯৯৮-৯৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৫১ বিলিয়ন ডলার। 

১৫ বছরের ব্যাবধানে দেশের অর্থনীতির বৈদেশিক রেমিটেন্স অর্ধেকের বেশি তৈরী পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যা এখন পর্যন্ত চলমান রয়েছে। তবে নিট বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ছিল এর মাত্র ৩০% কারণ, তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল এবং আনুষঙ্গিক উপকরণ আমদানিতে ব্যয় হয় আয়কৃত বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৭০%। বাংলাদেশের মতো একটা দেশে এতো অল্প সময়ের মধ্যে পোশাক কারখানার এই উন্নতি অভাবনীয়। এর মাঝে ও নানা সময়ে নানা প্রতিকুলতা আসছে, বিশেষ করে ১৯৭১ পূর্ববর্তী সময়ে পোশাক কারখানার আধিপত্য বিস্তার করে পাকিস্তানিরা, এতে অর্থনীতিক ভাবে ক্ষতির স্বীকার হয় পূর্ব পাকিস্তান।

২০১১-১২ অর্থবছরে সর্বমোট পোশাক রপ্তানির পরিমান ছিল ১৯,০৮৯.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং তা ২০১২-১৩ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১,৫১৫.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এর পরিমান ৯,৬৫৩.২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। শুধু যে রপ্তানি বৃদ্ধি পাচ্ছে তা নয় সাথে সাথে বাংলাদেশে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সংখ্যাও দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০০ এর উপর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি রয়েছে যেগুলো প্রতিনিয়তই দেশের অর্থনীতির জন্য কাজ করে চলছে। পোশাক শিল্প যে শুধু দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে তা ই নয় বিশ্ব দরবারে আমাদের দেশকে ব্যাপকভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। তৈরি করেছে ইতিবাচক ভাবমূর্তি। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ এখন এক গর্ব করার বিষয়, যা আমাদের দেশকে পৌঁছে দিয়েছে এক অন্য উচ্চতায়। সহস্র মাইল দূরের কোনো এক দেশে শোরুমে সাজানো পোশাকের গায়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা দেখে কোনো বাংলাদেশী আছেন যিনি শিহরিত না হন; পুলকিত মন একবার বলে না উঠে ‘শাবাস বাংলাদেশ’। এমনকি ফুটবল বিশ্বকাপ এর মতো বড় দরবারেও দুইটি দেশের জার্সি প্রস্তুত করা হয়েছিলো বাংলাদশ থেকে। 

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর বছর ২০২১ সালে তৈরি পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ বিলিয়ন বা ৫,০০০ কোটি ডলার। কিন্তু হঠাৎই একটা দূর্ঘটনা আমাদের এই লক্ষ্যমাত্রাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশই এখন মহামারি কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। অদৃশ্যমান এই ভাইরাস শুধু মাত্র আমাদের দেশের জনগণের স্বাস্থ্যের ওপরই প্রভাব ফেলেনি, ফেলেছে আমাদের দেশের অর্থনীতি তথাপি আমাদের দেশের পোশাক শিল্পের ওপর ও ফেলেছে। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের বিস্তার যত বাড়ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগও ততটাই ঘনীভুত হচ্ছে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পে এরই মধ্যে সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে এই শিল্প টিকে আছে ইউরোপ এবং আমেরিকার বাজারের উপর নীর্ভর করে।কিন্তু সেসব দেশে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের ফলে বহু পশ্চিমা ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে তাদের অর্ডার বাতিল কিংবা স্থগিত করছেন।

এছাড়াও বাংলাদেশের পুরো রপ্তানিএ ৮০ শতাংশ তৈরি পোশাক। আর এ তৈরি পোশাকের প্রায় ৬০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। আর এসব পণ্য উৎপাদন করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। করোনার কারণে চীন সহ বহিঃবিশ্বের সকল দেশের সাথেই দেশের বাণিজ্য এখন বন্ধ। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ আসে এই পোশাক শিল্প থেকে। বর্তমানে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বা বিজিএমইএ বলছে এখন পর্যন্ত বিদেশী ক্রেতারা তিন বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল করেছে।  বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে তীব্র সংকটের যে হাতছানি দেখা যাচ্ছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শ্রমিকরা। বিজিএমইএর তালিকাভূক্ত প্রায় চার হাজার কারখানায় ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করে। যাদের মধ্যে প্রায় ২০ লাখের বেশি শ্রমিক ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এই খাত থেকে আয় হয়েছে দুই হাজার ১৮৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে পাঁচ দশমিক পাঁচ-তিন ভাগ কম। করোনাভাইরাসের প্রকোপ আটকাতে বাংলাদেশ সরকার গত ২৬ শে মার্চ থেকে আসছে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত দেশজুড়ে কার্যত লকডাউন ঘোষণা করেছে।

কিন্তু এ পরিস্থিতিতেও বেশ কিছু গার্মেন্টস কারখানা চালু রয়েছে। মালিকরা বলছেন, হাতে যেসব কাজ রয়েছে সেগুলো সময়মতো শেষ করার জন্য কারখানা চালু রাখা জরুরী। এছাড়া কিছু কারখানা পার্সোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট তৈরি করছে বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ। এই মহামারী কারণে পোশাক শিল্প যে পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে তা কাটিয়ে ওঠাই আমাদের কাছে এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। এই ক্ষতির হার কিছুটা কমানোর জন্য সরকার ইতিমধ্যেই বেশকিছু প্রণোদন প্যাকেজ চালু করেছে। এছাড়াও তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের সহায়তা চেয়েছে৷ আপৎকালীন তহবিল গঠন, ঋণের নিশ্চয়তা স্কিমসহ আরো কয়েকটি দাবি জানিয়েছে তারা। সংশ্লিষ্ট সকলের এখন একটাই টার্গেট, কিভাবে এই করোনা ভাইরাসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠে আবার দেশের পোশাক শিল্প তথা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা যায়।

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ অনেকাংশেই দেশের অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তৈরী পোশাক খাতের ভূমিকা প্রতি বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই তো আমাদের দেশের অর্থনৈতিক চাহিদেকে আরও বেগবান করতে পোশাক শিল্পের কোন বিকল্প নেই একথা এখন খুব সহজেই বলা যায়। আমাদের উচিত এই শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করে দেশের অর্থনীতিতে অগ্রণী ভুমিকা পালন করা।

প্রতিবেদক:

১.মারুফ হোসেন মুন 
২.সন্দিপ সাহা

টি.ই.এস (টিম-বিইউএফটি)
ডিপার্টমেন্ট – টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাচ-২০১।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, textileaid24.blogspot.com, গুগল সার্চ। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here