[Traditional Textile Series] পর্ব-০৭ঃ যেভাবে জন্ম হয়েছিল টি-শার্ট।

0
588

▪ইংরেজরা বাংলায় আসার পর তাদের পোশাকের ছাপ পড়তে শুরু করে এ দেশের মানুষের পোশাকে। তবে মোঘলদের পোশাকের মতোই ইংরেজদের পোশাকও রাতারাতি সাধারণ মানুষের মধ্যে জায়গা করে নেয়নি। ইংরেজরা এই দেশে আসার পরেও বহুদিন এই দেশের মানুষেরা তাদের পোশাক গ্রহণ করেনি। ধীরে ধীরে প্রথমে অভিজাত এবং পরে সাধারণ মানুষদের মাঝে ইংরেজদের অনুকরণে পোশাক পরার প্রচলন শুরু হয়। মোঘলদের পতনের পরেও অনেকদিন পর্যন্ত এদেশের হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বীরাই মোঘলদের পোশাক পরিধান করতেন। সবথেকে প্রাচীন যে বয়নশিল্পের নমুনা পাওয়া যায় সেটি হচ্ছে একটি স্কার্টের ছেড়া অংশ, যা পাওয়া গিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব আর্মেনিয়ার আরেনি-১ গুহা থেকে। যদিও এর সাহায্যে বলা যায় না যে এটি আদৌ তাঁতযন্ত্রে বোনা কিনা। কার্বন ডেটিং-এর মাধ্যমে এর বয়স জানা যায় প্রায় ৫,৯০০ বছর পূর্বে। যেহেতু স্কার্টটির কেবল ভগ্নাংশই পাওয়া গেছে, কাজেই এটি অনুমান করা শক্ত যে পুরো স্কার্টটি দেখতে কেমন ছিলো বা কোনো নারী সেটা পরলে কেমন দেখা যেত।

▪সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কৃতির বিবর্তন হয়। মানুষের সর্বপ্রকার কর্মকান্ডের মধ্য দিয়েই তার সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চ শতকেও নাকি টি-আকৃতির পোশাকের অস্তিত্ব ছিল। তবে পোশাকে টি-আকৃতির যথাযথ দৃশ্যমান ঘটে ৯৬০ থেকে ১২৭৯ সাল সময়ে। এরপর কেটে যায় আরও কত শত বছর। ১৯০৭ সালে ইংল্যান্ডের স্যামুয়েল সায়মন ‘স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের’ কৌশল আবিষ্কার করলে বদলে যেতে শুরু করে গোল গলার, হাতা কাটা এ পোশাকের ইতিহাস। বর্তমান বিশ্বে টি-শার্ট ব্যাপক জনপ্রিয়। আরামদায়ক এই পোশাকের পেছনের ইতিহাস জানেন কি? সিঙ্গেল ব্যাচেলরদের কথা ভেবেই এই টি-শার্ট তৈরি করা হয়। কারও কারও দাবি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌ-বাহিনীর জন্যই বিশ্বে প্রথম টি-শার্ট তৈরি করা হয়। এ প্রসঙ্গে একাধিক তথ্যকে বিচার করে বলা যেতে পারে ১৮৮৯ সাল থেকে ১৯১৩ সালের মধ্যে তৈরি করা হয় টি-শার্ট। আর এই টি-শার্ট এখন সারাবিশ্বে জনপ্রিয়।

▪দুই বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন (৫ম শতক) ও হিউয়েন-সাঙের (৭ম শতক) ভ্রমণ কাহিনীতে ঐ সময়ের বাংলা অঞ্চলের মানুষদের পরিধেয় পোশাক-আচ্ছাদনের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। ৭ম শতকের পোশাকগুলি সাধারণত দরজি দিয়ে তৈরী কিংবা সেলাই করা ছিল না। তখনকার দীর্ঘ গ্রীষ্মকালে তাপ প্রতিরোধের জন্য অধিকাংশ মানুষ শাদা কাপড়ে পরত। ‘পুরুষরা একটা লম্বা কাপড় কটি বেষ্টন করে বাহুর নীচে দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে শরীর পেঁচিয়ে ডান দিকে ঝুলিয়ে দিত। বিশ শতকে গান্ধীজির পরনে এইরকম পোশাক দেখা যায়। মেয়েদের পোশাক-পরিচ্ছদ ও শরীরকে আচ্ছাদন করে কাঁধ ও মাথার উপর পর্যন্ত প্রসারিত হতো। সুলতানী আমলে বাংলার পোশাক ও সংস্কৃতিতে মুসলমানদের প্রভাব স্পষ্টভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সুলতান ও খানদের আঁটসাঁট পাতলুন, ঘাঁঘরা-সদৃশ আঁটো আস্তিনের লম্বা কোট অভিজাতদের মধ্যে প্রচলিত হয়। ছেলে ও মেয়েদের পোশাক ছিল মোটামুটি অভিন্ন। এমনকি মাথার টুপির আকৃতি ও সাজসজ্জা ছিল একই রকম। কাজী ও আলেমরা পড়তেন ঢিলে আলখাল্লা জাতীয় পোশাক এবং মাঝে মাঝে আরবীয় পোশাক। টি-শার্ট উদ্ভাবনের কোন সুনির্দিষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় নি। ঊনিশ শতকের আমেরিকায় ইউনিয়ন স্যুট নামে একধরনের অন্তর্বাস চালু ছিল। যা মানুষকে গলা থেকে পা পর্যন্ত এক পোশাকেই আবৃত করত। অনুমান করা হয় এই পোশাক থেকে টি-শার্টের উৎপত্তি। প্রথমত খনি শ্রমিক ও জাহাজের খালাসীরা এটা কেটে গরমে সুবিধাজনক পোশাক হিসেবে তৈরী করেন বাটওয়ালা বা বাটনছাড়া শার্ট। ইংরেজী ’টি’ অক্ষরাকৃতি হওয়ায় ইর নাম হয় টি-শার্ট ।

▪‘টি-শার্ট’ শব্দটির সঙ্গে বিশ্বের প্রথম পরিচিতি ঘটে ১৯২০ সালে। এফ স্কট ফিটজগেরল্ডের লেখা ‘দিজ সাইড অব দ্য পেরাডাইজ’ উপন্যাসে প্রথম এই শব্দজোট ব্যবহার হয়। একই বছর শব্দটি ‘মেরিয়াম-ওয়েবস্টার ডিকশনারি’ তে যুক্ত হয়। অল্প কথায় এটুকু টি-শার্ট হয়ে ওঠার গল্প। ১৯৩৯ সালের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের মার্ভিন লি রয় ‘দ্য উইজার্ড অব ওজ’ নামে একটি ছবি বানালেন। সংগীতনির্ভর কাল্পনিক এই ছবির প্রচারে ছাপানো হলো টি-শার্ট। ছবিতে চিত্রায়িত এমারল্ড শহরের বাসিন্দাদের ‘ওজ’ লেখা টি-শার্ট গায়ে দেখা যায়। এটিকে বাণিজ্যিক প্রচারণার কাজে টি-শার্টের প্রথম ব্যবহার হিসেবে মনে করা হয়। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাজ্য সরকার ধূমপানবিরোধী প্রচারের জন্য নির্মিত বিজ্ঞানে ‘উই ডোন্ট স্মোক’ লেখা টি-শার্ট ব্যবহার করে। এরপর যুক্তরাজ্যে ১৯৭০-এর দশকে জনসচেতনতা তৈরি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবি আদায়ের আন্দোলনে টি-শার্ট হয়ে ওঠে সিগনেচার পোশাক। একই সময়ে রক সংগীতের গায়কদের গায়েও ফ্যাশনপণ্য হিসেবে টি-শার্ট শোভা পায়। এসবে থাকত তাঁদের নিজেদের পছন্দের বিভিন্ন ছবি ও বার্তা। বহুমুখী ব্যবহার আর জনপ্রিয়তা দেখে ১৯৭৩ সালে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ টি-শার্টকে ‘বার্তা বহনের মাধ্যম’ (মিডিয়াম ফর দ্য মেসেজ) হিসেবে আখ্যায়িত করে। ১৯৭৭ সালে নিউইয়র্ক শহরের প্রচারে বাজারে আসে ‘আই লাভ নিউইয়র্ক’ টি-শার্ট।

▪১ম প্রিন্টেড টি-শার্টঃ

১৯৩৪ সালে ক্লার্ক গোবল নামের হলিউড তারকা ‘It happened on Night ’ সিনেমায় প্রথমবারের মত প্রদর্শন করেন খোলা বুক। যার আবেদন মেয়েদের মধ্যে তৈরী করে হুল্লোড় এবং পুরুষরা তাদের শরীর প্রদর্শনের জন্য বিকল্প কোন কিছু খুঁজতে থাকেন। এই মরিয়া পুরুষদের জন্য সুখবর বয়ে আনে ‘Sears’ কোম্পানী। ১৯২৮ সালে। ‘Gob Shirt’ অথবা ‘Sailor Shirt’ নামে এক ধরনের টি-শার্ট তারা বাজারজাত করেন মাত্র ২৪ সেন্টে। এটা অন্তর্বাস, বা মূল পোশাক হিসেবেও ব্যবহৃত হত। ১৯৪২ সালের ১৩ জুলাই ‘লাইফ’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ হয় ‘Air Corps Gunnery School’ নামের টি-শার্ট পরা ইউএস নেভি সদস্যের। এই টি-শার্টকেই প্রথম প্রিন্টেড টি-শার্ট বলে ধরে নেয়া হয়। ষাটের দশকে পৃথিবী দেখল Tye-Dying এবং Screen Printing দেয়া টি-শার্টের প্রচলন। এই ধরণের টি-শার্ট ব্যবহার করা হতো কমার্শিয়াল এ্যাডভারটাইজিং এর জন্য। স্যুভেনির মেসেজ ও প্রোটেস্ট আর্ট মেসেজও পরবর্তীতে এই ধরনের টি-শার্টে প্রাধান্য পায়।

▪টি-শার্টে মনের ভাব প্রকাশঃ

মনের আবেগ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে টি-শার্টের ব্যবহার শুরু হয়েছিল সেই আশির দশক থেকেই। সে সময় বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছিল নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড। এ ধারার ব্যাপকতা তৈরি হয় বিশেষ দিবসকে ঘিরে। ডিজাইনার ক্যাথরিন হ্যামনেট বড় করে স্লোগান ছাপানো টি-শার্টের ডিজাইন করা শুরু করেন। এরপর ২০০০ সাল থেকে স্লোগানসমৃদ্ধ টি-শার্টের প্রচলন শুরু হয়। শুধু ভাবগম্ভীর স্লোগান নয়; হাস্যরসাত্মক বার্তাবাহী টি-শার্টও পায় তুমুল জনপ্রিয়তা। এরপর থেকে আমাদের দেশে বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের উক্তি সংবলিত টি-শার্ট ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ব্যক্তিগত ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও টি-শার্ট ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর আগে  অর্থাৎ সত্তর দশক থেকে টি-শার্ট পণ্য বিপণন-বাজারজাতকরণের বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

▪সংগীত ও সিনেমা জগতে টি-শার্টঃ

পুরো সত্তরের দশক জুড়ে সংগীত টি-শার্টের জনপ্রিয়তায় প্রধান ভূমিকা পালন করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ‘The Rolling Stone’ এর জিভ বের করা মুখের লোগো সম্বলিত টি-শার্টের ব্যাপক বিক্রি। কিন্তু আশির দশকে এসে টি-শার্ট পুরোপুরি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে থাকে। বহুজাতিক কোম্পানীগুলো তাদের লোগো ও মেসেজসহ টি-শার্ট উৎপাদন করতে থাকে প্রচারণার অংশ হিসেবে। স্যুভেনির হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে তাদের উত্থানপর্বে স্যুভেনির হিসেবে টি-শার্ট প্রচলন করতে দেখা যায়। নব্বইয়ের দশকে লাইসেন্সড টি-শার্ট খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সিনেমার চরিত্র, পোস্টার বিশেষত চরিত্রগুলোর পরিধেয় টি-শার্ট ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘‘Forest Group’’ সিনেমার ‘Budda Group’’ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ২১ শতকের শুরুতে এসে টি-শার্ট ব্যক্তির আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপিত হয় এবং টি-শার্টের ব্যবহারে নতুন মাত্রা যোগ হয়।

▪টি-শার্ট উৎসবঃ

সারা বছরের টি-শার্ট নিয়ে বছরের প্রথমদিকে একবার টি-শার্ট উৎসব করা হয়। বাংলাদেশের তরুণদের পোশাক সংস্কৃতিতে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করে এই উৎসব। ২০০৯ সালে শুরু হয়ে প্রতি বছর এই উৎসব হচ্ছে এবং দেশীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, চেতনার বিপণন নতুন প্রণোদনা পাচ্ছে। শুধু ঐতিহাসিক ব্যক্তি নয় বা বিষয়ের দৃশ্যই নয়, আমাদের টি-শার্টে রয়েছে প্রয়োজনীয় মেসেজ। এতে শুধু বাণিজ্য নয়, ঐতিহ্যের বিশ্বায়নও হবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।

বর্তমানে প্রচারণার এক বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই টি শার্ট। আপনার প্রতিবাদ, প্রোডাক্ট প্রচার, দীন প্রচার, স্লোগান, স্মৃতিময় বক্তব্য, প্রবাদ নানা কিছু উঠে আসছে এই টি শার্টে। নতুন এই প্যাটার্নকে পছন্দও করছেন তরুণ সমাজ। কেনই করবেন না, এর মধ্যে ফুটে উঠছে আপনার ব্যক্তিত্ব, আপনার সামাজিক ভূমিকাসহ নানা বিষয়। মনের গোপন বক্তব্যও তুলে আনা যাচ্ছে এ মাধ্যমে খুব সহজে।

Writer:
Sajjadul Islam Rakib 
Campus Ambassador: Textile Engineers 
National Institute of Textile Engineering and Research-NITER (10th Batch)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here